
শেষ আপডেট: 2 August 2022 15:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যাবতীয় হুঁশিয়ারি, হুমকি অগ্রাহ্য করে আজই তাইওয়ান পৌঁছতে চলেছেন আমেরিকার হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি (Nancy Pelosi)। এই পরিস্থিতিতে রীতিমতো স্পষ্ট দুই দেশের ঠান্ডা লড়াই। বলা ভাল, লড়াই আর 'ঠান্ডা' নেই। চিন-তাইওয়ান সীমান্তে চিনের ট্যাঙ্ক সাজানোর ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে। মনে করা হচ্ছে, বিশ্বের অন্যতম দুই পাওয়ার সেন্টার চিন এবং আমেরিকার মধ্যে দ্বন্দ্বের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে চলেছে তাইওয়ান।
ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান আসা নিয়ে প্রথম থেকেই আপত্তি জানিয়েছে বেজিং। এমনকি কয়েক দিন আগেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছিলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং। সেই সময়েই তাইওয়ান নিয়ে বাইডেনকে সতর্ক করেছিলেন জিংপিং, সরাসরি বলেছিলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে আমেরিকা যেন 'আগুন নিয়ে খেলা' না করে। এতে চিনের 'এক চিন' নীতির বিরুদ্ধে যাওয়া হবে বলেও দাবি করা হয় চিনের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে। বলা হয়, 'এর ফল ভাল হবে না।' যদিও বাইডেন চিনকে পাল্টা জানিয়ে দিয়েছিলেন আমেরিকা তাইওয়ানের পক্ষেই রয়েছে।
কূটনীতিকরা বলছেন আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির অবস্থান। ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নেতা তিনি। বিশ্ব রাজনীতির মহলে তিনি কট্টর চিন-বিরোধী বলেই পরিচিত। তিনি প্রথম থেকেই চিনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সোচ্চার। এর আগেও তিনি চিন সফরে গিয়ে তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে গিয়েছিলেন, বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এমনকি ভিন্ন মতের কারণে চিন যাঁদের নির্বাসন দিয়েছে, তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে ন্যান্সির।
এদিকে চিন মনে করে, তাইওয়ান তাদেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাইওয়ানের স্বাধীনতাকামী মানুষের সঙ্গে লালফৌজের সংঘাত নতুন ঘটনা নয়। ফলে মার্কিন সংসদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইপেই সফরকে আমেরিকান সরকারের পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি উসকানি হিসেবেই দেখছে চিন। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, চিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন যে অবস্থায় রয়েছে, তার উপর ন্যান্সি পেলোসির এই সফর যেন নতুন অস্বস্তি তৈরি করছে।
চিন এবং তাইওয়ান দুই দেশেই ন্যান্সি পেলোসির এই আসন্ন সফর নিয়ে উত্তেজনার চূড়ান্ত। সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ দখল করে রয়েছে এই খবর। নানা বিশ্লেষণে বারবারই উঠে আসছে, চিন-তাইওয়ানের সম্পর্কে আরও কতটা খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে ন্যান্সির এই সফর। তবে উল্টোদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অবশ্য সাধারণ মানুষজন এই নিয়ে তেমন ভীত বা সন্ত্রস্ত নন। বরং দেখা যাচ্ছে, বহু মানুষই এই বিষয়টি হাল্কাভাবেই নিচ্ছেন এবং লিখছেন, 'এটা তো নতুন কিছু নয়!'
তবে পরিস্থিতি যে খুব স্বাভাবিক বা আর পাঁচবারের মতো নেই, তা আন্দাজ করছেন কূটনীতিকরা। মনে করা হচ্ছে, জোরদার বাধার মুখে পড়বেন ন্যান্সি পেলোসি। যদিও এই নিয়ে তাইওয়ান জানিয়েছে, বিদেশের যে কোনও অতিথিকেই তারা স্বাগত জানাচ্ছে দেশে। চিনের ভয়ে ভীত নয় তাইপেই।
ট্যাঙ্ক দিয়ে তাইওয়ান ঘিরছে চিন, মার্কিন স্পিকারের সফর নিয়ে বেজিং-ওয়াশিংটন নয়া সংঘাত
আকাশপথে প্রতিরোধ
ন্যান্সি পেলোসি যে বিমানটিতে রয়েছেন, সেটিকে ঘিরে তাইওয়ানের আকাশ সীমায় নিয়ে চলে যাওয়া হতে পারে, যাতে তিনি কিছুতেই তাইপেতে অবতরণ না করতে পারেন। প্রসঙ্গত, এর আগে ২০২০ সালে তৎকালীন মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যালেক্স আজার যখন তাইওয়ান যান, তখনও চিনা যুদ্ধবিমান তাইওয়ানের আকাশসীমার একদম প্রান্তে পৌঁছে যায় এবং তাইওয়ানের বিমানকে ধ্বংস করার হুঁশিয়ারি দেয়।
এমনটা যে হতে পারে, সেই ইঙ্গিত মিলেছে চিনা কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপাত্র হিসাবে পরিচিতি সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমসের প্রাক্তন প্রধান সম্পাদক হু শি জিনের টুইট থেকে। তিনি লিখেছেন, 'পেলোসির বিমান ঘিরে তাইওয়ান-নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমায় প্রবেশ করতে পারে চিনা যুদ্ধবিমান। কারণ এই পরিস্থিতিতে চিনকে শক্ত সামরিক ব্যবস্থার পথ নিতেই হবে।'
তাইওয়ানের কাছে মিসাইল হানা
ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের ঠিক আগে এয়ারক্র্যাফট কেরিয়ার কিলার মিসাইল ডিএফ ১৭-র একটি বিধ্বংসী ভিডিও ফুটেজ সামনে এনেছে চিন। বলা হয়েছে, সামরিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এই এয়ারক্রাফট কেরিয়ার কিলার হাইপারসনিক মিসাইল কোনও ভাবে ছাড়া হলে তা নাকি থামানো অসম্ভব। গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, এই মিসাইলের গতি এবং শক্তি শত্রু দেশের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকেই ভেঙে দিতে সক্ষম। এটি ২৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত শত্রুপক্ষের মধ্যে আঘাত হানতে পারে।
বাণিজ্য-বিপর্যয়
তাইওয়ানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পার্টনার চিন। সেই সুযোগ নিয়ে তাইওয়ানের পণ্য বয়কট করতে পারে বেজিং। ইতিমধ্যেই তাইওয়ানের ১০০টি সাপ্লায়ারের কাছ থেকে খাদ্যদ্রব্য নেওয়া বন্ধ করেছে চিন। তাইওয়ানের মূল জলপথ, তাইওয়ান প্রণালীতে ইতিমধ্যেই টহল দিচ্ছে যুদ্ধজাহাজ। যে কোনও সময়ে বন্ধ হতে পারে প্রণালী। শুধু তাই নয়, তাইওয়ানের অন্যান্য বাণিজ্য পথেও নানা বাধা তৈরি করার ক্ষমতা রয়েছে চিনের। ফলে ন্যান্সির সফর ঘিরে যদি সরাসরি সংঘাত পরিস্থিতি তৈরিই হয়, তাহলে বেজিংয়ের হাতে একাধিক অস্ত্র রয়েছে অর্থনৈতিকভাবে তাইওয়ানকে বিপদে ফেলার।