সিঙ্গুর বরাবরই মমতার জন্য পয়মন্ত। ২০১১ সালে বাংলায় পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিল সিঙ্গুর। শুধু তা নয়, মমতার সেই আন্দোলনই এ দেশে শতাব্দী পুরনো জমি আইন সংশোধনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছিল।

নরেন্দ্র মোদী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 20 January 2026 14:18
রাজনীতি ধারণায় চলে। বিজেপির বহু কর্মীর তো বটেই সাধারণ মানুষেরও অনেকের ধারণা ছিল, রবিবাসরীয় দুপুরে সিঙ্গুরের (Singur) মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) বড় ঘোষণা করবেন। কিন্তু বাংলায় ‘মহা-জঙ্গলরাজ’ ও উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে কিছু কথা বললেও, তেমন কোনও সুনির্দিষ্ট বড় ঘোষণা মোদী করেননি। তাতে হতাশই হয়েছেন অনেকে। এবার সেই সিঙ্গুরে দাঁড়িয়েই বড় ঘোষণা করতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)।
সিঙ্গুর (Singur) বরাবরই মমতার জন্য পয়মন্ত। ২০১১ সালে বাংলায় পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিল সিঙ্গুর। শুধু তা নয়, মমতার সেই আন্দোলনই এ দেশে শতাব্দী পুরনো জমি আইন সংশোধনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছিল। ২০১৬ সালের ভোটের পরও সিঙ্গুরে ফিরে গিয়ে সর্ষের বীজ ছড়িয়েছিলেন দিদি।
কী ঘোষণা? কত বড় ঘোষণা (What CM Mamata Banerjee Will Announce)
নবান্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত কোনও অঘটন না ঘটলে ২৮ জানুয়ারি বুধবার সিঙ্গুরে সভা করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। সেই সভা হবে প্রশাসনিক। বাংলায় আরও ১৬ লক্ষ পরিবারকে বাড়ি বানানোর জন্য ওই মঞ্চ থেকে প্রথম কিস্তির টাকা দেওয়া শুরু করবেন মুখ্যমন্ত্রী।
১৬ লক্ষ পরিবারকে যে তাঁর সরকার বাড়ি বানানোর টাকা দেবে, সেই ঘোষণা আগেই হয়েছে। শহর বা শহরতলিতে বসে হয়তো আন্দাজ করা যাবে না, এ ব্যাপারে বড় প্রত্যাশা রয়েছে জেলা ধরে ধরে গ্রাম-গরিবের। ১৬ লক্ষ পরিবার মানে প্রায় কমবেশি ৬০ থেকে ৮০ লক্ষ মানুষ মাথার উপর পাকা ছাদ পাবেন। এ জন্য রাজ্য সরকারের খরচ হবে প্রায় ১৯ হাজার কোটিরও কিছু বেশি টাকা। ১৬ লক্ষ পরিবার বাড়ি বানাতে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা করে পাবেন। অর্থাৎ এই বাবদ খরচ হবে ১৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে প্রশাসনিক খরচ আরও বেশ কিছু টাকা হবে।
কেন এই ঘোষণা ঐতিহাসিক (Why it is a milestone)
বাংলায় অতীতে কোনও সরকার, কোনও একটি প্রকল্প খাতে এত স্বল্প পরিসর বা সময়ের মেয়াদে এক লপ্তে এত হাজার কোটি টাকা খরচ করেনি। সেই অর্থে এই ঘোষণা হতে চলেছে মাইলফলক।
নীতীশ-মোদীর থেকে বড় ঘোষণা (Bigger than Nitish-Modi’s announcement)
বিহারে এবার বিধানসভা ভোটে নীতীশ কুমার-নরেন্দ্র মোদী জুটির গেম চেঞ্জার ঘোষণা ছিল মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা (Mukhyamantri Mahila Rozgar Yojan)। এই প্রকল্প খাতে রাজ্যের ১ কোটি ২০ লক্ষ মহিলাকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মতে, ওই এক প্রকল্পেই এবার ভোটে বাজিমাৎ করেছেন নীতীশ। অর্থাৎ সেই প্রকল্পের জন্য বিহার সরকারের খরচ হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। মমতা সরকার বাংলার বাড়ি খাতে নতুন করে বরাদ্দ করছেন ১৯ হাজার কোটি টাকা। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পে ১২ লক্ষ পরিবারের জন্য চলতি আর্থিক বছরেই সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
একে তো বাংলায় লক্ষ্ণীর ভাণ্ডার (lakshmir bhandar) প্রকল্প খাতে সাধারণ শ্রেণির মহিলারা এর থেকে বেশি টাকা পান। বাংলার মহিলারা পান বছরে ১২০০০ টাকা। নীতীশ কুমার মহিলাদের আত্মনির্ভর হওয়ার জন্য ওই টাকা দিয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের আগে যে বাংলার বাড়ি বাবদ ঘোষণা করতে চলেছেন তা স্থায়ী সম্পদ তৈরি করবে।
মোদী ও সিঙ্গুর (Narendra Modi - Singur)
গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর ক্ষুরধার দৌত্যে এই সিঙ্গুর থেকেই ন্যানোকে সানন্দে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন মোদী। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, মোদী হয়তো বলবেন, বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে সিঙ্গুরকে তেমনই বড় কোনও শিল্প ফিরিয়ে দেব। কেন তিনি তেমন কোনও কথা বলেননি, তা অনেকের কাছেই রহস্য। বিজেপির অনেকের মতে, কোনও গ্রাউন্ড ওয়ার্ক ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এমন কোনও ঘোষণা শোভা পায় না।
দলের রাজ্য কমিটির এক সদস্যর মতে, বাংলায় ভোটের প্রচার তো সবে শুরু। প্রধানমন্ত্রী এর পরেও ঘোষণা করতে পারেন। সুতরাং অসহিষ্ণুতার কোনও জায়গা নেই। আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী বাংলায় আরও বহুবার প্রচারে আসবেন, নতুন ঘোষণা করবেন। তখন এমনিই ধারণার বদল হয়ে যাবে।
মমতার কৌশল (Mamata Banerjee Strategy)
রাজ্য রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই একটা কথার আমদানি করেছিলেন। ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝে নেব। সেই কারণেই শুভেন্দু অধিকারী কোথাও সভা করলে পরদিনই দিদি দলের কোনও নেতাকে সেখানে পাঠান তৃণমূলের সভা করতে। এমন শঠে শাঠ্যং হরবকত চলছে। বাংলার বাড়ির ব্যাপারে ঘোষণা বা সভার জন্য সেই কৌশলগত কারণেই বেছে নেওয়া হয়েছে সিঙ্গুরকে। মোদীকে মোকাবিলা করাও হল, নতুন ঘোষণাও হল। এক ঢিলে অনেক পাখি।