প্রধানমন্ত্রীকে মণিপুর নিয়ে খোঁচা দিতেও ছাড়েননি মমতা। তিনি বলেন, “যিনি মণিপুরে জাতিগত হিংসার ৯৬৪ দিন পর গিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর হঠাৎ বাংলার প্রতি এই অতিরিক্ত উদ্বেগ সহমর্মিতা নয়—বরং নিছক রাজনৈতিক নাটক বলেই মনে হয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নরেন্দ্র মোদী
শেষ আপডেট: 6 October 2025 23:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বৃষ্টি ও ভূমিধসে (Rain and Landslide) বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের নাগরাকাটা (Nagrakata) সোমবার রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রেও পরিণত হল। দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দুপুরে স্থানীয়দের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন শিলিগুড়ির (Siliguri) বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ (BJP MLA Shankar Ghosh) এবং মালদা উত্তরের সাংসদ খগেন মুর্মু (BJP MP Khagen Murmu)। রাতে সেই ঘটনাকে কেন্দ্রে করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) চাপানউতোরও তীব্র হয়ে উঠল।
প্রধানমন্ত্রীর সাফ কথা, “যেভাবে আমাদের দলের সহকর্মীরা—যাদের মধ্যে একজন বর্তমান সাংসদ ও বিধায়কও রয়েছেন—পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সেবা করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটি তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) অসংবেদনশীলতা ও রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার করুণ অবস্থার প্রতিফলন।” মোদীর এ কথা মাটিতে পড়তে না পড়তে, সপাট জবাব দিতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী কোনও প্রমাণ, তদন্ত বা প্রশাসনিক রিপোর্ট ছাড়াই সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে (WB Govt) দোষী সাব্যস্ত করেছেন। এটি শুধু রাজনৈতিক নীচতা নয়, বরং সাংবিধানিক মূল্যবোধের পরিপন্থী, যে মূল্যবোধ রক্ষার শপথ তিনিই নিয়েছিলেন। গণতন্ত্রে বিচার হয় আইনের পথে, রাজনৈতিক বক্তৃতা বা টুইটের মাধ্যমে নয়”।
প্রবল বর্ষণ ও ধসের ফলে নাগরাকাটা, বামনডাঙ্গা, বানারহাট, রামসাই—ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও জলমগ্ন। এই পরিস্থিতিতে সোমবার সকালে বিজেপির সাংসদ খগেন মুর্মু ও বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ স্থানীয় বাসিন্দাদের অবস্থার খবর নিতে নাগরাকাটায় যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁদের গাড়ি এলেই কিছু গ্রামবাসী ক্ষোভ দেখান। অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে কোনও সমন্বয় না করেই তাঁরা দুর্গত এলাকায় প্রবেশ করেন, সঙ্গে ছিল বিশাল কনভয়। শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি, তারপরই চলে ইটবৃষ্টি। এই ঘটনায় বিজেপি শিবির দাবি করেছে— হামলার পিছনে ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের “পালিত গুন্ডারা”। অন্যদিকে, স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, “বিজেপি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উস্কানি দিতে গিয়েছিল।”
এর পরই এদিন রাতে এক্স (X)-এ প্রতিক্রিয়া জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তিনি লেখেন, “আমি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অনুরোধ করছি, এই কঠিন পরিস্থিতিতে হিংসায় না জড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াক। আমি বিজেপি কর্মীদের আহ্বান জানাই, তাঁরা যেন জনগণের পাশে থেকে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালিয়ে যান।”
এ ধরনের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) কখনও জবাব দেওয়া বকেয়া রাখেন না। এদিনও অন্যথা হয়নি। পাল্টা টুইটে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, “যখন গোটা স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ উদ্ধার ও ত্রাণকার্যে দিনরাত কাজ করছে, তখন বিজেপি নেতারা বিশাল গাড়ির বহর এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা নিয়ে দুর্গত এলাকায় পৌঁছেছেন—তাও আবার স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশের কাছে কোনও তথ্য না জানিয়েই। তাহলে এই ঘটনার দায় রাজ্য প্রশাসন, স্থানীয় পুলিশ বা তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর কীভাবে চাপানো যায়?”
মুখ্যমন্ত্রী এও বলেন, “যে নির্বাচনী কেন্দ্রের মানুষ নিজেরাই একজন বিজেপি বিধায়ককে বেছে নিয়েছেন, সেই কেন্দ্রেই ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে তৃণমূলের তথাকথিত “গুণ্ডামি” বলে আখ্যা দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত? এই ধরনের অযথা, অপ্রমাণিত অভিযোগ শুধু অপরিপক্বই নয়, দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত একজন নেতার মর্যাদাকেও খাটো করে”।
শুধু তা নয়, এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে মণিপুর নিয়ে খোঁচা দিতেও ছাড়েননি মমতা। তিনি বলেন, “যিনি মণিপুরে জাতিগত হিংসার ৯৬৪ দিন পর গিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর হঠাৎ বাংলার প্রতি এই অতিরিক্ত উদ্বেগ সহমর্মিতা নয়—বরং নিছক রাজনৈতিক নাটক বলেই মনে হয়। আমরা সকলে নিঃসন্দেহে হিংসাকে নিন্দা করি। কিন্তু এটি রাজনৈতিক প্রচারের সময় নয়, এটি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করার সময়, একে অপরের ক্ষত সারানোর সময়”।
মুখ্যমন্ত্রীর এও অভিযোগ, বিজেপি আবারও উত্তরবঙ্গ বনাম দক্ষিণবঙ্গ বিভাজনের পুরনো রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে চাইছে। উদ্দেশ্য হল ভোটের আগে মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। কিন্তু মনে রাখা দরকার, বাংলা এক—আবেগে, সংস্কৃতিতে ও রাজনীতিতেও।
উত্তরবঙ্গের মানুষ যখন ধস ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষত থেকে উদ্ধার পাচ্ছেন, তখন রাজনীতির এই তরজা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। নাগরাকাটার বামনডাঙ্গা, মডেল ভিলেজ ও আশেপাশের গ্রামগুলো এখনও জলবন্দি। বহু মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়ে রয়েছেন। প্রশাসন উদ্ধার ও পুনর্বাসন নিয়ে ব্যস্ত। স্থানীয়দের বক্তব্য—“রাজনীতি এখন নয়, দরকার খাবার, জল আর ঘর। নেতা-মন্ত্রীদের দোষারোপের খেলায় আমাদের কষ্ট আরও বাড়ছে।”