
শেষ আপডেট: 12 November 2023 15:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তখন নকশাল আন্দোলনে উত্তাল বাংলা। ধিকিধিকি নয়, কলকাতাতেও রীতিমতো দাউদাউ করে জ্বলছে আন্দোলনের আগুন। সেইসব 'আর্বান নকশাল'দের ঐক্য ভাঙতে মরিয়া লালবাজার। থানায় তুলে এনে অবর্ণনীয় অত্যাচার, এনকাউন্টারে খুন, কোনও কিছুই যেন জল ঢালতে পারছে না আগুনে। পুলিশ-নকশাল লাগাতার সংঘর্ষে তটস্থ সাধারণ মানুষও। মরিয়া লালাবাজার তখন কলকাতার কিছু ব্যায়াম করা, বিরুদ্ধ রাজনীতিতে বিশ্বাসী অল্পবয়সি যুবকদের নিয়ে তৈরি করেছিল অক্সিলিয়ারি ফোর্স। কড়া হাতে আন্দোলন দমন করার নির্দেশ তো ছিলই, সঙ্গে ফোর্সের সদস্যদের নকশালদের চোরাগোপ্তা নিকেশ করার নির্দেশও পুলিশ দিয়ে রেখেছিল বলে শোনা যায়।
সেই বাহিনী থেকেই উত্থান ফাটাকেষ্টর। কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে কেষ্টর নামের আগে কীভাবে 'ফাটা' জুড়ে গেল সে গল্প অন্যদিন হবে। ফাটাকেষ্ট ছোট থেকেই ছিল কালীভক্ত। মধ্য কলকাতার সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের গায়ে নরসিংহ লেনে ছিল তার বাড়ি। পাশেই ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি। সেখানে নিয়মিত মঙ্গলারতি দেখতে দেখতেই পাড়ায় কালীপুজো করা শুরু করেছিল ফাটাকেষ্ট। এলাকারই কয়েকজকে সঙ্গে করে নবযুবক সংঘের ব্যানারে শুরু হয়েছিল বারোয়ারি কালীপুজো।
কেষ্টর মাথায় মঙ্গলময়ীর আশীর্বাদ ছিল কিনা তা ঈশ্বরই জানেন। তবে শোনা যায়, একদিকে নকশাল দমনে পুলিশ এবং তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, আর নিজের ক্যারিশমা- দুইয়ের মিশেলে অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকার ত্রাস হয়ে উঠেছিল ফাটাকেষ্ট। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল তার কালীভক্তি। আর তার ফল হিসেবেই পাড়ার বারোয়ারি কালীপুজো আকারে বহরে বাড়তে শুরু করল। প্রতিমার উচ্চতা বাড়ল, সঙ্গে মণ্ডপের আকার। গলির মোড়ের পুজোকে দেরি না করে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে তুলে আনলেন কেষ্ট।
এবার শুধু মণ্ডপ কিংবা প্রতিমার আকার নয়। জাঁক-জমকে নতুন রেকর্ড তৈরি করতে শুরু করল ফাটাকেষ্টর পুজো। ৫০ বছর আগের সেই পুজোতে চন্দননগরের আলোকশিল্পীদের দিয়ে লাইটিং করাতেন কৃষচন্দ্র। মণ্ডপসজ্জা আর জৌলুসে চোখ ধাঁধিয়ে যেত দর্শনার্থীদের।
এর সঙ্গেই যুক্ত হল প্রতিযোগিতা। পাশেই কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্রের পুজো। তাঁর পুজোর সঙ্গে কেষ্টর পুজোর সোচ্চার কম্পিটিশন চলত। পুজো একদিনে মিটে গেলেও দুটি পুজোতেই ১২-১৫ দিন করে রাখা থাকত প্রতিমা। সোমেন মিত্রের পুজোর থেকে মাতৃমূর্তি ১ দিন বেশি মণ্ডপে রাখতে পারলেও সেটাই যেন কেষ্টর জয়।
পাড়ার বারোয়ারি পুজো যে কবে কীভাবে 'মিথ' হয়ে উঠল, তা স্পষ্ট করে বলা যায় না। তবে স্থানীয়রা বলেন, ফাটাকেষ্টর পুজোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল তার রাজনৈতিক উত্থান। তখন লোকমুখে গ্রাম-শহর-রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ফাটাকেষ্টর পুজোর নাম। পড়শি রাজ্য থেকেও নাকি লোকে দেখতে আসত এই পুজো।
ফাটাকেষ্টর পুজোর অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিসর্জনের শোভাযাত্রা। সীতারাম ঘোষ ট্রিট থেকে ৪-৫ কিলোমিটার দূরেই গঙ্গা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য আয়োজন করা হত একের পর এক লরির। একটি লরিতে তোলা হত মায়ের মূর্তি। বাকি লরিতে থাকত আলোকমালায় সজ্জিত দরজা। ৫০ বছর আগে ফাটাকেষ্টর সেই ভাসান যাত্রা দেখতে নাকি কার্যত জনবিস্ফোরণ হত।
যে রাস্তা দিয়ে শোভাযাত্রা যেত তার আশেপাশের রাস্তা, বাড়ি, দোকান, গাছ কোথাও পা ফেলে দাঁড়ানোর জায়গা থাকত না। ওইটুকু রাস্তা যেতে সময় লাগত ঝাড়া ৩ ঘণ্টা! শোনা যায়, এই দৃশ্য দেখতে নাকি ভিন রাজ্য থেকেও লোক আসত। একটি কালীপুজো কার্যত জনশ্রুতিতে পরিণত করেছিল কৃষ্ণচন্দ্র দত্তকে। ততদিনে পিতৃদত্ত নাম ভুলে ফাটাকেষ্ট নামেই পরিচিত হয়ে গেছেন তিনি। ফাটাকেষ্টর সেই পুজোর নাম শোনেননি, এমন লোক বাংলায় পাওয়া যেত না।
ফাটাকেষ্টর পুজোয় নিয়মিতই অতিথি ছিলেন রুপোলি পর্দার বিভিন্ন তারকা। বিখ্যাত এই পুজোয় প্রতি বছর হাজির হতেন মহানায়ক উত্তম কুমার। শুধু হাজিরই হতেন না, তিনি ছিলেন ফাটাকেষ্টর পুজোর রিসেপশন কমিটির চেয়ারম্যান। যদিও এর নেপথ্যে অন্য একটি গল্প আছে।
১৯৭১ সালের কথা। তখন ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটেই থাকতেন উত্তম কুমার। রোজ সকালে ভিক্টোরিয়া চত্বরে হাঁটতে যেতেন তিনি। কিন্তু একদিন এমন এক ঘটনা দেখে ফেলেছিলেন তিনি, যার জন্য শহর ছেড়ে পালাতে হয়েছিল তাঁকে। বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করে ছিলেন মহানায়ক। শোনা যায়, চোখের সামনে পুলিশের হাতে দেশব্রতী পত্রিকার সম্পাদক সরোজ দত্তকে খুন হতে দেখেছিলেন তিনি। এই পত্রিকার অফিস ছিল কেশব চন্দ্র সেন স্ট্রিটে। পাশেই ফাটাকেষ্টর পুজো হত।
এই সরোজ দত্ত ছিলেন নকশালপন্থী। তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। শোনা যায়, সরোজকে 'মুক্তি' দেওয়ার নাম করে জিপ থেকে নামিয়ে পালাতে বলেছিল পুলিশ। সে কথায় বিশ্বাস করে তিনি হাঁটতে শুরু করা মাত্রই রুনু গুহনিয়োগী, সুজিত স্যন্যালের নেতৃত্বে গুলি চালায় পুলিশ। রক্তাক্ত শরীরে সেখানেই লুটিয়ে পড়েন সরোজ দত্ত। সেই দৃশ্যই নাকি প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে দেখে ফেলেছিলেন উত্তম কুমার।
মহানায়ক যে পুরোটা দেখেছেন তা বুঝতে পেরেছিল লালবাজারের বাহিনীও। আবার সে কথা নকশালদের কানেও পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে একইসঙ্গে উভয় তরফে উত্তম কুমারের উপর চাপ আসতে শুরু করে। পুলিশের তরফে চাপ দেওয়া হচ্ছিল সত্যি গোপন করার জন্য, আর নকশালদের তরফে সাক্ষী দেওয়ার জন্য।
এই দুইয়ের চাপে তখন দিশেহারা উত্তম। জনশ্রুতি বলে, সেই সময় এই বিপদ থেকে মহানায়ককে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন ফাটাকেষ্ট। তাঁর পরামর্শেই শ্যুটিং ফেলে কলকাতা ছাড়েন উত্তম কুমার। বোম্বেতে গিয়ে আশ্রয় নেন এক চিত্র তারকার বাড়িতে। বেশ কিছুদিন আরব সাগরের পাড়ে আত্মগোপন করে থাকার পর যখন ঘটনার রেশ বেশ খানিক স্তিমিত, তখন কলকাতায় ফিরে আসেন তিনি।
এই ঘটনার পর থেকেই ফাটাকেষ্টর পুজোর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সখ্য গড়ে ওঠে মহানায়কের। ১৯৭৯ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্তও প্রত্যেক বছর কৃষ্ণচন্দ্র দত্তের পুজোয় হাজির হতেন তিনি। শোনা যায়, ফাটাকেষ্ট পুজোর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী সোমেন মিত্রর পুজোয় হাজার অনুরোধ উপরোধেও যাননি তিনি।
মহানায়ক প্রাণের ঋণ শোধ করেছিলেন কি এভাবেই? নাকি নিছকই ভক্তি, কিংবা সম্পর্ক রক্ষা? সে প্রশ্নের উত্তর মেলে না।