
শেষ আপডেট: 12 November 2023 14:45
পঞ্চাশ বছর আগের কথা। মধ্যমগ্রামের বাদু অঞ্চলটি তখন একেবারে গ্রাম। গাছের ঘন ছায়া ঘেরা পুকুর, বিঘের পর বিঘে ধানি জমি, মাঠঘাট শুনশান, শুধু পাখির কলকাকলি শোনা যেত দিনভর। বাদুর কাছেই কাঞ্চনতলায় বসবাস করতেন মাতৃসাধক দিলীপ চট্টোপাধ্যায়। ছায়া সুনিবিড় পুকুরপাড়ে একটি বড় নিম গাছের নীচে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঈশ্বরচিন্তা করতেন তিনি। তাঁর আকুল মাতৃসাধনায় পরম সন্তুষ্ট হয়েছিলেন মা কালী। মা স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন ভক্ত দিলীপকে।
• পুকুর থেকে পাওয়া গেল মায়ের মূর্তি
প্রতি বছর দীপান্বিতা অমাবস্যায় মাটির মাতৃমূর্তি এনে পুজো হত নিম গাছটির নীচে। সাধককে স্বপ্নাদেশ দিলেন মা কালী। বললেন, "নিমগাছের পাশের পুষ্করিণীতে আমার কষ্টি পাথরের মূর্তি আছে। ওই মূর্তি উদ্ধার করে তুই প্রতিষ্ঠা কর। নিত্যপুজো করবি। বৈষ্ণব মতে পুজো হবে। বলিদান বা আমিষ ভোগ নয়। এটি আমার কল্যাণী রূপ।"
পরদিন ভোরবেলা উঠেই পুকুরপাড়ে গেলেন সাধক। পুকুর থেকে পাওয়া গেল ছোট্ট দেড় ফুটের কষ্টি পাথরের মাতৃমূর্তি। মায়ের স্নিগ্ধ দু'চোখে ঝরে পড়ছে অপার স্নেহ। দিলীপ চট্টোপাধ্যায় বুকে করে মায়ের মূর্তি এনে বসালেন নিম গাছের নীচে। এখানেই তৈরি হল কল্যাণময়ী মায়ের মন্দির।
• তন্ত্র মতে নয়, বৈষ্ণব মতে মায়ের পুজো হয়
গত বছর ছিল কাঞ্চনতলার এই মন্দির প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশতম বছর। তাই মন্দিরটি খুব যত্ন করে সংস্কার করিয়েছেন প্রয়াত সাধক দিলীপ চট্টোপাধ্যায়ের নাতি মাতৃসাধক শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়। কথা হচ্ছিল শঙ্খর সঙ্গে। বললেন, "আমাদের এই কল্যাণময়ী মায়ের মহিমা অপার। বাদু থেকে এতটা ভেতরে কাঞ্চনতলা। মায়ের জন্য কোনও প্রচার নেই। অথচ প্রতিদিন ভোর রাত থেকে দলে দলে ভক্ত আসেন মায়ের কাছে। খুব জাগ্রত আমাদের মা। ভক্ত মায়ের কাছে যা প্রার্থনা করেন, মা তা পূর্ণ করেন। সংসারের অভাব-অভিযোগ, রোগভোগ, অশান্তি-মনোমালিন্য থেকে মুক্ত করেন মমতাময়ী দেবী। দেবীর নির্দেশ মেনে তন্ত্র মতে নয়, বৈষ্ণব মতে মায়ের পুজো হয়।"
• দেবীর প্রিয় ভোগ পরমান্ন
কালীপুজোর রাতে খুব ধুমধাম করে মায়ের আরাধনা হয়। ফুলে ফুলে সেজে ওঠে মন্দির। মা বেনারসি শাড়ি আর অলংকারে সাজেন। মায়ের প্রিয় ভোগ ঘিয়ের পরমান্ন আর খিচুড়ি। তার সঙ্গে থকে পাঁচ রকম ভাজা, তরকারি, চাটনি। এছাড়া মায়ের পছন্দের খাদ্যতালিকায় আছে চিঁড়ে, গুড় , নারকেল। ভক্তরা প্রসাদ পান। মায়ের স্বপ্নাদেশ মেনেই এখানে আমিষ পদ ভোগে থকে না। আগেই বলা হয়েছে এখানে পশুবলি হয় না। যদি কেউ না জেনে মায়ের কাছে ছাগ বলি মানত করে ফেলেন, তাহলে ক্ষীরের ছাগ তৈরি করে বলি দেওয়া হয়।
•মন্দিরে মায়ের বিশেষ পুজোর দিনক্ষণ
দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপুজোর রাতে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কল্যাণময়ী মায়ের আরাধনা করেন প্রয়াত মাতৃসাধক দিলীপ চট্টোপাধ্যায়ের নাতি সাধক শঙ্খ। এছাড়াও মহালয়ার দিন মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে মায়ের মন্দিরে খুব ধুমধাম করে পুজো হয়। ফলহারিনী কালীপুজো ও রটন্তী কালীপুজোতেও মায়ের মন্দিরে বিশেষ পুজো হয়ে থাকে।
নিম গাছটিকে ভক্তরা কল্যাণময়ী মায়ের কল্পতরু বৃক্ষ মনে করেন। মায়ের কাছে মনোস্কামনা জানিয়ে গাছে ডোর বাঁধেন। মা ভক্তের মনের আশা পূর্ণ করেন অপার স্নেহে। গাছের মাটি ঘরে রাখলে সংসারে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে ,এমনই বিশ্বাস ভক্তদের। মন্দির চত্বরে আছেন দেবদিদেব মহাদেবও। সেই শিবলিঙ্গও খুব জাগ্রত। তিনিও ভক্তকে সবরকম বিপদ থেকে রক্ষা করেন। আছেন শালগ্রাম শিলাও।
কাঞ্চনতলার কল্যাণময়ী মায়ের মন্দিরের পরিবেশ এত শান্ত সমাহিত যে মন আপনি নত হয়ে আসে মায়ের পায়ে। মায়ের স্নেহমাখা চোখের দিকে তাকালে হৃদয় ভরে ওঠে আনন্দে। কল্যাণময়ী মা যে আনন্দস্বরূপিনী।