দ্য ওয়াল ব্যুরো: শসার মতো নয়, ঠিক যেন শসাই। বলে না দিলে বা না জানলে যে কোনও কেউ এই প্রাণীকে শসা বলেই ভুল করবেন। সমুদ্র তলদেশে বাস তাদের। এমনই এক অদ্ভুত ও মূল্যবান প্রাণী, সি কিউকাম্বার বা 'সামুদ্রিক শসা' এখন বিপন্ন প্রজাতিতে পরিণত। কারণ মানুষের লোভ। সমুদ্রের তলদেশের এই প্রাণীটিও বাঁচেনি সেই লোভ থেকে। চোরাশিকারের কারণে প্রায় ধ্বংস হতে বসেছে গোটা প্রজাতি।
এবার তাদেরই রক্ষা করার তাগিদে ভারতের লাক্ষাদ্বীপে তৈরি করা হল পৃথিবীর প্রথম সামুদ্রিক শসা সংরক্ষন অঞ্চল বা 'সি কিউকাম্বার কনজারভেশন রিজার্ভ'। লাক্ষাদ্বীপের চেরিয়াপনী রিফে ২৩৯ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি এই সংরক্ষণ অঞ্চলটির প্রশংসা করেছেন বিশ্বের তাবড় প্রকৃতিবিদরা। সামুদ্রিক পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানী-গবেষকরা জানিয়েছেন, গোটা পৃথিবীর সামুদ্রিক জীবনে এ এক বড় পদক্ষেপ।

গত বছরের শেষ দিকেই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাক্ষাদ্বীপে মোতায়েন করা বিশেষ বাহিনী প্রায় দু'হাজার সামুদ্রিক শসা উদ্ধার করে সুহালি দ্বীপ থেকে। প্রায় ৮০০ কেজি ওজনের ঐ সামুদ্রিক শসাগুলির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে চার কোটি টাকারও বেশি। তদন্তে ধরা পড়ে, তাদের শ্রীলঙ্কায় পাচার করার চেষ্টা চলছিল। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সাহায্যে ধরা পড়ে যায় বিষয়টি। তবে কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। বিষয়টি এখন সিবিআই তদন্তের অধীনে।
এর পরে ফের ১৫ জানুয়ারি এক অনামী দ্বীপ থেকে পুলিশ ও বিশেষ রক্ষীবাহিনী মিলে ১৭২টি সামুদ্রিক শসা উদ্ধার করে। যাদের ওজন ছিল মোট ২৩০ কেজি, দাম প্রায় দেড় কোটি টাকা। এই ঘটনায় চার জন মাফিয়াকে গ্রেফতার করা গেছে। ফের এমন ঘটনা ঘটে ২৩ জানুয়ারি। ৫২টি মৃত সামুদ্রিক শসা-সহ এক জনকে গ্রেফতারর করা হয়। উদ্ধার হওয়া মৃত জীবগুলির দাম ছিল প্রায় ৫ লাখ টাকা।

মূলত চিন এবং দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে খাবার হিসেবে এই প্রাণীটির বিশেষ চাহিদা আছে। ওষুধ তৈরির কাজেও ব্যবহৃত হয় সামুদ্রিক শসার দেহাংশ। সেই কারনেই ভীষণ মূল্যবান এই জীব। আন্তর্জাতিক বাজারে সমাদৃত।
ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ভারত মহাসাগরের সমুদ্র-মাফিয়াদের বিশেষ নজর থাকে এই জীবের ওপর। বাঘ, সিংহ বা অন্যান্য মূল্যবান প্রাণীর মতোই চোরাশিকার চলে এই প্রাণীটির। ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষন আইনের আওতায় আসে সামুদ্রিক শসা। ২০০১ থেকে ভারতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয় এই প্রাণীটির শিকার।

তার পর থেকেই আরও বেড়েছে মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য। জানা গেছে, শ্রীলঙ্কাই হল এই চোরাশিকারিদের মূল ঘাঁটি। সেখান থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার বাজারগুলিতে ছড়িয়ে যায় এই সামুদ্রিক জীব। খাবার হিসেবে বিশেষ চাহিদা ছাড়াও যৌন অক্ষমতা, বাত, ক্যানসার ইত্যাদি নানা রোগের ওষুধও এই প্রাণীর দেহ থেকে তৈরি হয় বলে জানা গেছে।
মুম্বাইয়ের 'ন্যাচারাল হিস্ট্রি' সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পৃথিবীতে মোট ১৪৫০ রকম প্রজাতির সামুদ্রিক শসার অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এর মধ্যে ১৭৩টি প্রজাতিই ভারতীয় সমুদ্রে মেলে। তাদের মধ্যে আবার ১৬টি প্রজাতি বেশি রকমের মূল্যবান। লাক্ষাদ্বীপ ছাড়াও গালফ অফ ম্যানার এবং বঙ্গোপসাগরের কিছু অঞ্চলেও এই জীব দেখা যায়।
:max_bytes(150000):strip_icc()/braised-sea-cucumber-964244938-a60079865c284e0b931d059463dd1d52.jpg)
বিজ্ঞান বলছে, মাটির ক্ষেত্রে কেঁচো যতটা মূল্যবান, সমুদ্র তলদেশে এই জীবটিও ততটিই। সমুদ্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ও ভারসাম্য বজায় রাখায় এই প্রাণীটির ভূমিকা অপরিহার্য। সমুদ্রে ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের মাত্রা বজায় রাখার জন্য এই প্রাণীর বর্জ্য বিশেষ প্রয়োজন। এই ক্যালসিয়াম কার্বোনেট আবার কোরাল রিফের অর্থাৎ প্রবাল প্রাচীর তৈরিতে কাজে লাগে। ফলে লাক্ষাদ্বীপের সামগ্রিক কোরাল ইকোসিস্টেমের জন্যই এই জীবের ভূমিকা বিশাল।

কিন্তু ইদানীং চোরাশিকার আর সামুদ্রিক দূষণের কবলে প্রায় শেষ হতে বসেছে এই প্রজাতি। এ সব কিছু মাথায় রেখে, তাদের অনুকূল পরিবেশ দেওয়ার জন্য পৃথিবীর প্রথম সামুদ্রিক শসা সংরক্ষণ অঞ্চল তৈরি হল লাক্ষাদ্বীপে। আপাতত ২৩৯ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি হলেও, পরবর্তী কালে আমিনি ও পিট্টী দ্বীপপুঞ্জের মাঝে বিশাল ৩৪৪ বর্গ কিমি জায়গা জুড়ে দ্বিতীয় একটি অঞ্চল সংরক্ষিত হতে পারে
মনে করা হচ্ছে, এই সংরক্ষণের মাধ্যমে সামুদ্রিক শসার নিরাপত্তা অনেকটাই সুনিশ্চিত করা যাবে, রক্ষা করা যাবে সমুদ্রের ভারসাম্য।