দু'চোখ ধাঁধানো প্রোফাইল, লাস্যময়ী তরুণীদের ছবি, আর বন্ধুত্বের মিষ্টি টোপ—এই তিন অস্ত্রেই তৈরি হয়েছিল নিখুঁত শিকারের ফাঁদ।

গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন।
শেষ আপডেট: 25 November 2025 13:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু'চোখ ধাঁধানো প্রোফাইল, লাস্যময়ী তরুণীদের ছবি, আর বন্ধুত্বের মিষ্টি টোপ—এই তিন অস্ত্রেই তৈরি হয়েছিল নিখুঁত শিকারের ফাঁদ। টার্গেট একটাই: শহরের ধনী যুবকরা (Rich youths under the guise of friendship)। ডেটিং অ্যাপে (Dating App) আলাপ, তারপর কথায় কথায় ঘনিষ্ঠতা। কখনও হোটেলে ডাকা, কখনও হঠাৎ করে পাঠানো নগ্ন ভিডিও।
আর এই ঘনিষ্ঠতার দড়ি ধরেই শুরু হত ব্ল্যাকমেলিং। কখনও এটিএম কার্ড ছিনিয়ে নেওয়া, কখনও জোর করে অনলাইন ট্রান্সফারের মাধ্যমে টাকা হাতানো—সব কিছুই ছিল সুপরিকল্পিত। সেই ‘পারফেক্ট স্ক্রিপ্ট’-এর পরিচালক ও নেপথ্যের দুই মুখ কমল সাহা এবং তার লিভ-ইন পার্টনার ধ্রুব মিত্র। কিন্তু চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট আদর্শ লোসালকার ক্ষেত্রে পা পিছলে গেল অভিযুক্তদের। আর সেই ভুলই টেনে বের করে আনল কসবা হত্যাকাণ্ডের জটিল পর্দা। কসবা কাণ্ডের (Kasba Case) প্রাথমিক তদন্তে এমনটাই দাবি পুলিশ সূত্রের।
রবিবার গ্রেফতারের পর রাতভর জেরা করে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ধৃতদের জেরায় জানা গিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়া ঘেঁটে তারা বুঝে যায় যে পরিচয়ের অ্যাপই ‘ব্ল্যাকমেলিং’-এর সবচেয়ে সুরক্ষিত মাধ্যম। তাই দু'জনে মিলে খুলে ফেলে নিজেদের ডেটিং অ্যাপ। সেই অ্যাপে একাধিক আকর্ষণীয় মহিলাকে নিয়োগও করেছিল কমল, যাতে ধনী পুরুষদের সহজে টেনে আনা যায়। পরিকল্পনা এতটাই সুচারু ছিল যে আগে কখনও তারা ধরা পড়েনি।
কিন্তু আদর্শের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। পুলিশ সূত্রে খবর, কসবার হোটেলে টাকা নিয়ে বিবাদ বাধতেই ধ্রুব ঘরে আসে। উত্তেজনার মুহূর্তে সে আদর্শের মুখে সপাটে চড় মারে। সেই আঘাতেই নাকের হাড় ভেঙে যায়। তার পরও প্রতিরোধ করায় তাকে ‘খুন করতে বাধ্য’ হয়েছে বলে দাবি করেছে কমল-ধ্রুব। রাত তখন প্রায় বারোটা। এরপর দু’জনে অল্প সময়েই সিদ্ধান্ত নেয় গোটা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার। আদর্শের মোবাইল, এটিএম কার্ড আর পার্স নিয়ে দ্রুত হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ে তারা।
পুলিশের কাছে জেরা-সূত্রে উঠে এসেছে পালানোর নাটকীয় কাহিনি। অ্যাপ-ভ্যান ধরে উল্টোডাঙায় পৌঁছে রাত তিনটায় কমল আদর্শের সিম খুলে নিজের ফোনে ঢোকায়। সেখানকার একটি এটিএমে গিয়ে প্রথমে পিন বদলে নেয়। তারপর তোলে প্রায় তিন হাজার টাকা। কিছু ক্ষণ পর বারাকপুরে যায় দু’জনে—যেখানে কমলের একটি বাড়ি রয়েছে। পালানোর সুরক্ষিত জায়গা ভেবে সেখানে সময় কাটালেও আতঙ্ক কাটেনি। ফলে বারাকপুর থেকেও পালিয়ে যায় তারা কৃষ্ণনগরে। কৃষ্ণনগর শহরের এটিএম থেকে আরও দু’হাজার টাকা তুলে রাতভর মদ্যপান করে। তারপর ওই সিম খুলে ফেলে দেয়। শেষে ফের কলকাতায় ফিরে আসে এক আইনজীবীর পরামর্শে।
তবে পুলিশের মতে, আদর্শের সিম ব্যবহার করাই শেষ পর্যন্ত কাল হল কমলের। সেই সিগন্যাল ধরেই পুলিশ পৌঁছে যায় তাদের নাগাল পর্যন্ত। চাপ বাড়তেই শেষপর্যন্ত গ্রেফতারের মুখে পড়ে দু'জনই।
সোমবার কমল ও ধ্রুবকে আলিপুর আদালতে তোলা হয়। সরকারি আইনজীবী সৌরিন ঘোষাল জানান, ঘটনার পুনর্নির্মাণ ও ব্যবহৃত সিম উদ্ধারের জন্য ধৃতদের পুলিশি হেফাজত জরুরি। আদালত দু’জনকেই ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছে।
ডেটিং অ্যাপের আড়ালে এমন বিপজ্জনক প্রতারণা ও খুনের ঘটনায় আতঙ্কিত শহর। উঠছে প্রশ্ন—এমন অ্যাপ কতটা নিরাপদ? এবং কতজনই বা এর ফাঁদে অজান্তে পা দিচ্ছেন!