বোলপুরে সেন্ট জেভিয়ার্স ইউনিভার্সিটির ক্রিসমাস লেকচারে ফাদার জন ফেলিক্স রাজ তুলে ধরলেন মাদার টেরেজার জীবন, দর্শন ও উত্তরাধিকার।

বোলপুরে ফাদার ফেলিক্স।
শেষ আপডেট: 15 December 2025 17:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতা তথা বাংলার মানুষের কাছে তিনি চিরকাল একটাই পরিচয়ে পরিচিত—মাদার টেরেজা। মানবতার প্রতীক, নিঃস্বার্থ সেবার জীবন্ত মূর্তি। সেই মাদার টেরেজার জীবন, কর্ম এবং উত্তরাধিকারকে নতুন আলোয় তুলে ধরল সেন্ট জেভিয়ার্স ইউনিভার্সিটি, কলকাতা।
২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর, শান্তিনিকেতনের বোলপুরে অবস্থিত সেন্ট জেভিয়ার্স ইউনিভার্সিটি কলকাতার সামাজিক কর্মকাণ্ড কেন্দ্র ‘পরশমণি’-তে অনুষ্ঠিত হল বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রিসমাস লেকচার। এই বিশেষ বক্তৃতা প্রদান করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য রেভারেন্ড ফাদার জন ফেলিক্স রাজ।
নিজের বক্তব্যের শুরুতেই ফাদার জন বলেন, “কলকাতার মানুষের কাছে সেন্ট টেরেজা মানেই, প্রথম এবং শেষ পরিচয়ে—মাদার টেরেজা।” এই মন্তব্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে যায় শহর ও মানুষের সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।
এক বক্তৃতায় ফাদার জন মাদার টেরেজার জনসেবামূলক কাজের ইতিহাসের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাও মেলান। তিনি মাদার টেরেজার জীবনকে ব্যাখ্যা করেন “সমগ্র বিশ্বের জন্য এক মানবিক স্তোত্র” হিসেবে। তাঁর মতে, মাদার টেরেজার জীবন ছিল নিরলস সহানুভূতির কর্মযজ্ঞ—যেখানে প্রার্থনা, নীরবতা ও সেবা একসূত্রে বাঁধা।
বক্তৃতায় ফাদার জন প্রথমে ফিরে যান মাদার টেরেজার শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোতে। তিনি তুলে ধরেন, কীভাবে লোরেটো অর্ডারের এক সাধ্বী হিসেবে জীবন শুরু করলেও, পরে তাঁর জীবনে আসে এক গভীর অন্তর্দ্বন্দ্ব ও উপলব্ধি—যাকে মাদার নিজেই বলেছিলেন, “a call within a call” বা ‘ডাকের ভিতর আর এক ডাক’। এই অন্তরের ডাকই তাঁকে ঠেলে দেয় নিঃস্বার্থভাবে দরিদ্র, অসহায় ও পরিত্যক্ত মানুষের সেবায়।
ফাদার জন মাদার টেরেজার দর্শনের কয়েকটি মূল দিক বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, মাদার বিশ্বাস করতেন—শান্তি ও দানশীলতার শুরু ঘর থেকেই। নীরবতা ও প্রার্থনা মানুষকে সেবার পথে নিয়ে যায়, আর সেবা থেকেই জন্ম নেয় প্রকৃত শান্তি। অন্যের সেবা মানেই ঈশ্বরের সেবা—এই বিশ্বাসই ছিল তাঁর কাজের মূল ভিত্তি।
বিশ্বভারতীর অধ্যাপক, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের উপস্থিতিতে ফাদার জন মাদার টেরেজার কলকাতা ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে করা কাজের বিস্তারিত বিবরণ দেন। কীভাবে তিনি দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, মৃত্যুপথযাত্রীদের শেষ মুহূর্তে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন, এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় শিশুদের জীবন বাঁচাতে হস্তক্ষেপ করেছেন—সবই উঠে আসে তাঁর কথায়।
বক্তৃতায় উঠে আসে যিশু সমাজ বা জেসুইট অর্ডারের সঙ্গে মাদার টেরেজার সম্পর্কের কথাও। ফাদার জন নিজের সঙ্গে মাদারের বহু উষ্ণ, মানবিক ও আন্তরিক সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের স্মৃতি ভাগ করে নেন। সেই স্মৃতিচারণ ছিল একই সঙ্গে ব্যক্তিগত, আবার আলোকময়ও।
তিনি আরও বলেন, মাদার টেরেজার বন্ধুত্ব ও যোগাযোগের পরিসর ছিল বিস্তৃত। পোপ জন পল দ্বিতীয়, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু থেকে শুরু করে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—সকলের সঙ্গেই তাঁর ছিল আলাদা সম্পর্ক ও সংযোগ।
বক্তৃতার শেষভাগে ফাদার জন মাদার টেরেজার দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট করেন, সমালোচকদের সমস্ত প্রশ্ন ও অভিযোগ সত্ত্বেও মাদারের কণ্ঠস্বর ও কাজ আজও আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যাত্রার শুরুতে হাতে গোনা কয়েকজনকে নিয়ে শুরু হওয়া ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’ আজ বিশ্বজুড়ে ৫,৭৫০ জন সন্ন্যাসিনীর এক বিশাল মানবসেবামূলক সংগঠন।
সবচেয়ে গভীর ও অর্থবহ বিশ্লেষণে ফাদার জন মাদার টেরেজাকে ‘বাংলার মা’ হিসেবে কল্পনা করেন। তাঁর মতে, মাদারের চরিত্রে ছিল মা দুর্গার মতোই এক দৃঢ়, রক্ষাকারী শক্তি—যিনি একই সঙ্গে দেবী এবং জননী। এই ভাবনাতেই যেন মাদার টেরেজা হয়ে ওঠেন বাংলার আত্মার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা এক সর্বজনীন মা।