সম্প্রতি সুইস বায়ু মান নিরীক্ষক সংস্থা IQAir সমস্ত দেশের সঙ্গে এদেশেরও বাতাসের মান পরীক্ষা করে। ফলাফল, এদেশের জন্য মারাত্মক! তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর দিল্লি। সেই তালিকারই প্রথম দশে রয়েছে মুম্বই ও কলকাতা।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 22 October 2025 19:06
দিল্লিতে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। দূষণে নাজেহাল রাজধানীর বাসিন্দারা, প্রতিবছরের মতো ক্ষোভে ফেটে পড়ছে একাংশ। শহর ছেড়েছেন বা নিজেকে একেবারে ঘরবন্দি করেছেন কিছুজন। দিল্লি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। যাঁরা উচিত শিক্ষা দিতে নেমে পড়েছেন, তাঁদের একটা অংশ বাঙালি। এদিকে নিঃশব্দে কিন্তু তাঁদেরও মাতৃভূমি অর্থাৎ বাংলা ঢাকছে বিষাক্ত বাতাসে। ধীরে ধীরে লাফিয়ে বাড়ছে ক্ষতিকারক ধুলিকণার পরিমাণ আর অজান্তেই ফুসফুসজনিত সমস্যার শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।
সম্প্রতি সুইস বায়ু মান নিরীক্ষক সংস্থা IQAir সমস্ত দেশের সঙ্গে এদেশেরও বাতাসের মান পরীক্ষা করে। ফলাফল, এদেশের জন্য মারাত্মক! তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর দিল্লি। সেই তালিকারই প্রথম দশে রয়েছে মুম্বই ও কলকাতা। যা ভাবার মতো বিষয়।
পরীক্ষার পর যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তা কিছুটা এমন- বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলির মধ্যে প্রথমে দিল্লি, দ্বিতীয় স্থানে পাকিস্তানের লাহোর, তৃতীয় কুয়েত সিটি, চতুর্থ করাচি, পঞ্চম মুম্বই, সপ্তম তাশখন্দ, অষ্টম কলকাতা, নবম ক্যানবেরা এবং দশম জাকার্তা।
কীভাবে নিঃশব্দে বাড়ছে শহরের দূষণ?
তিলোত্তমার এই ভয়াবহ দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে দ্য ওয়ালের তরফে যোগাযোগ করা হয়েছিল পরিবেশবিদ সুভাষ দত্তর সঙ্গে। কীভাবে বাড়ছে দূষণ, কীভাবে এর প্রতিকার করা সম্ভব এবং শহরের এই পরিস্থিতির জন্য কে বা কারা দায়ি, কিছুটা ধারণা দিলেন তিনি।
প্রথমেই শহরের এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, পরিবেশবিদ সাফ জানান, দিল্লির অবস্থা খুবই খারাপ। তুলনায় এশহর ভাল আছে। কিন্তু বাতাসের যা মান, তা একেবারেই আশানুরূপ নয়। দিল্লি নিয়ে মাতামাতি করা হয় ঠিকই, এবার এ শহর নিয়ে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। 'দূষণ মূলত কয়েকটি জিনিসের ওপর নির্ভর করে, তার মধ্যে প্রথম জনসংখ্য়া,' বলেন তিনি। এই জনসংখ্যার নিরিখে শহরে গাড়ির পরিমাণও দিন দিন বাড়ছে, যা নিয়ন্ত্রণের কোনও পরিকাঠামোই নেই, ভাবনাচিন্তাও নেই কারও। তাই নিজেরাই হাতে ধরে এই শহরকে এমন পরিস্থিতির মুখে ফেলছি বলে মনে করেন তিনি।
পরিবেশবিদ হিসেবে তাঁর যাত্রা বহু বছরের, শহরকে চোখের সামনে 'উন্নত' হতে দেখেছেন, সেই প্রসঙ্গ টেনেই নিজে লজ্জিত বলে জানালেন সুভাষবাবু। তাঁর কথায়, 'আমরা নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ছি। একজন পরিবেশবিদ হিসেবে মানুষকে এত বছরেও সচেতন করতে পারলাম না, এটা আমার ব্যর্থতা। আমার লজ্জা! এটা সুইসাইডের মতো খানিকটা, যেখানে থাকি, সেই জায়গাটাই শেষ করে দিচ্ছি। বানাচ্ছি গ্যাস চেম্বার। সচেতন হওয়ার সময় এসেছে, শুধু সাধারণ মানুষ না, প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা, স্কুল-কলেজ সকলকে সচেতন হতে হবে।'
নিজের ভাল পশুরাও বোঝে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই দূষণের খবর নিয়ে ওয়াকিবহল, তাঁরা জানেন কোথা থেকে কী হচ্ছে, তিলে তিলে শেষ হচ্ছে শহরের বাতাস। এখন ময়দানে গেলেও কতোটা শুদ্ধ বাতাস ইনহেল করা যাবে সেনিয়ে সন্দেহ রয়েছে অর্থাৎ নিজের ভাল পশুরাই বোঝে, মানুষ বোঝে না। পরিবেশবিদ সুভাষ দত্তর মতও তাই। মানুষ কোনওভাবেই বোঝে না কীভাবে কবর খুঁড়ছে নিজেদের জন্য। এ শহর তো বোঝেই না।
তাঁর সঙ্গে কথোপকথনে উঠে আসে সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্টের কথা। অর্থাৎ উন্নয়ন হবেই কিন্তু তা যেন ভবিষ্যতের কথা ভেবে হয়। উত্তরাখণ্ড থেকে হিমাচল, দার্জিলিং থেকে মহারাষ্ট্র, দেশের সাম্প্রতিক কিছু প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মনে করিয়ে দেন, শহর, সমতল হলেও এ বিষয়ে ভাবতে হবে সবাইকে। বলেন, 'উন্নয়নের নামাবলি গায়ে দিয়ে যে ধ্বংস হচ্ছে, তার ফল আমাদের এবং পরের প্রজন্মকে ভুগতে হবে। উন্নয়ন তো হবেই কিন্তু পরিবেশের কথা ভাবব না, সেটা হয় না। পরিবেশ মাথায় রেখে উন্নয়ন। আজ ধুঁকছে দিল্লি-সহ সব শহর। আমরা তো খাদের কিনারায়। শুধু বাতাস নয় মারাত্মক পরিমাণে জল ও মাটি দূষণ হচ্ছে। সেটা নিয়েও কথা হচ্ছে না। মাটির নীচ থেকে সব জল তুলে নিচ্ছি। গ্যাস চেম্বার বানিয়ে ফেলছি শহরটাকে।'
আজ গাছের ভাইফোঁটা করে শহরবাসীকে সচেতন করেন সুভাষবাবু। এই কাজ গত ২০ বছর ধরে করছেন। এই প্রসঙ্গেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, দূষণ রোধে কী ধরনের গাছ লাগানো উচিত। কারণ আজকাল রাস্তার ধারের গাছ কেটে বদলে ফুলের গাছ বসিয়ে দেওয়া হয়। এনিয়ে বেশ কিছু রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, যে গাছের পাতা বড় বড়, তারা অনেক কার্বণ শুষে নিতে পারে, শীতে ঝড়ে যায় না, এই ধরনের গাছ লাগাতে হবে রাস্তার ধারে। দূষণ কমাতে এই ধরনের গাছ লাগানো খুবই প্রয়োজন এবং তাও যত দ্রুত সম্ভব।
দার্জিলিঙে ম্যানগ্রোভ!
দার্জিলিঙের বিগত কিছুদিনের অবস্থা ও মুখ্যমন্ত্রীর ম্যানগ্রোভ লাগানোর পরামর্শ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি শুরুতেই বলেন, 'পাহাড়ে হয় না কি! নোনাজলে হয়, সুন্দরবনে হতে পারে।' সুন্দরবনে ২০ বছর ধরে কাজ করার সুবাদে, তিনি ম্যানগ্রোভ গাছ ও তার ধরন খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সে কথা উল্লেখ করে জানিয়ে দেন, পাহাড়ে ম্যানগ্রোভ লাগানো যায় না। শেষে বলেন, 'তাহলে কি পাইন লাগাব সুন্দরবনে আর ম্যানগ্রোভ পাহাড়ে? প্রকৃতির বিষয় এটা।'
রবি ঠাকুরের উদাহরণ টেনে সুভাষবাবুর বক্তব্য, 'শান্তিনিকেতনে আজ থেকে ৮০-১০০ বছর আগে রবি ঠাকুর এমনভাবে পরিকল্পনা করে গাছ লাগিয়েছিলেন যাতে সব সিজনে ফুল-ফল হয়, পরিবেশ রক্ষা করে সেই গাছ। এটা একটা সায়েন্স, বলে দিলেই হয়ে যায় না।'