“বিচারপতিরা কখনও রক্তপিপাসু হতে পারেন না”, খুনের ঘটনায় অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শোনাল কলকাতা হাইকোর্ট (Kolkata High Court)।

কলকাতা হাইকোর্ট
শেষ আপডেট: 7 August 2025 16:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: “বিচারপতিরা কখনও রক্তপিপাসু হতে পারেন না”, খুনের ঘটনায় অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শোনাল কলকাতা হাইকোর্ট (Kolkata High Court)।
২০২৩ সালের ২৮ জুলাই, জলপাইগুড়ির ধূপগুড়িতে নিজের মামার বাড়িতে পাঁচ সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে ডাকাতি করতে গিয়ে মামাকে খুন করেছিল আফতাব আলম। সেই মামলায় স্থানীয় দায়রা আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু সেই রায়ে হস্তক্ষেপ করে কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চ বলেছে, এই অপরাধ 'রেয়ারেস্ট অফ দ্য রেয়ার' গোত্রে পড়ে না।
বিচারপতি ভট্টাচার্য রায়ে বলেন, “শাস্তির তিনটি মূল স্তম্ভ— প্রতিশোধ, প্রতিবিধান এবং সংস্কার। আজকের দিনে প্রতিশোধের জায়গা নিচ্ছে সংস্কারের চিন্তাভাবনা। কারাগারের নাম ‘প্রিজন’ থেকে পরিবর্তন করে ‘করেকশনাল হোম’ করা হয়েছে একটি দৃষ্টিভঙ্গির বদলের ইঙ্গিতস্বরূপ।”
তিনি আরও বলেন, “যদি কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, সেই জীবন আর ফেরানো যায় না। ভবিষ্যতে যদি নতুন কোনও প্রমাণ উঠে আসে, তদন্ত পুনরায় খোলা হলেও তা প্রয়োগ করার উপায় থাকে না। ফলে মৃত্যুদণ্ড একবার কার্যকর হলে তা চূড়ান্ত এবং অপরিবর্তনীয়।”
আদালতের পর্যবেক্ষণ, "অপরাধকে ঘৃণা করো, অপরাধীকে নয়"— এই নীতিতেই গড়ে উঠেছে আধুনিক বিচারব্যবস্থা। আলমের আইনজীবী জানান, খুনটি না পূর্বপরিকল্পিত বা ঠান্ডা মাথায় করা, বরং তাৎক্ষণিক। অপরদিকে রাজ্যের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর দাবি করেন, আলমের দোষ প্রমাণিত এবং মৃত্যুদণ্ড বজায় রাখা উচিত।
কিন্তু বিচারপতি জানান, আলমের বয়স মাত্র কুড়ির ঘরে এবং তাঁর বিরুদ্ধে এমন কোনও তথ্য নেই যা প্রমাণ করে যে তিনি সংশোধনের ঊর্ধ্বে। উপরন্তু, মামার বাড়ি ছেড়ে আলম দীর্ঘদিন দিল্লিতে বসবাস করছিলেন, ফলে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’-এর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই বলে মনে করেছে আদালত।
বিচারপতি রায়ে উল্লেখ করেন ১৯৮০ সালে সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) ঐতিহাসিক 'বচন সিং বনাম পাঞ্জাব সরকার' মামলার রায়, যেখানে বলা হয়েছিল, “বিচারপতিরা রক্তপিপাসু হতে পারেন না।” সেই ভাবনার সূত্র ধরেই বর্তমান মামলার রায়টি সংস্কারমূলক বিচারবোধকে তুলে ধরেছে।
আফতাব আলমকে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করতে হবে, তবে কোনও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি না ঘটলে ২০ বছরের আগে মুক্তির সুযোগ থাকবে না— এই শর্তে রায় ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট।
বস্তুত, গত বছর ৯ অগস্ট আরজি কর-কাণ্ডকে কেন্দ্র করে যখন গোটা রাজ্য প্রতিবাদে শামিল, তখন হাসপাতালের মহিলা চিকিৎসক খুনে দোষী সাব্যস্ত সঞ্জয় রায়ের ফাঁসির দাবি তুলেছে বিভিন্ন মহল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সঞ্জয়ের ফাঁসির দাবিতে সরব হয়েছিলেন। আরও একটা ৯ অগস্টের দোরগোঁড়ায় হাইকোর্টের এহেন পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।