দেবতার অন্তরালে এ যেন এক দৈবাহতের আর্ততাণ্ডব! এক লুপ্তপ্রায় শিল্পকে জিইয়ে রাখার অন্তিম উপস্থাপনা। সেই গোমীরার কথাই তুলে ধরল ভবানীপুর মুক্ত দল।

ভবানীপুর মুক্ত দলের প্রতিমা
শেষ আপডেট: 25 September 2025 23:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গোমিরা নৃত্য (Gomira Dance), স্থানীয়দের মুখে পরিচিত ‘মুখা খেল’ নামে। পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) দিনাজপুর জেলার এই প্রাচীন লোকনৃত্য আজও গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের গর্ব। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন, অশুভ শক্তিকে দমন আর শুভ শক্তিকে আহ্বান জানাতে দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য এই নাচের আয়োজন করা হয়। দেব-দেবীর কাছে প্রার্থনা থাকে একটাই— জীবনে আসুক মঙ্গল, দূর হোক অমঙ্গল। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গোমিরা নৃত্য তাই শুধু বিনোদন নয়, বরং এক গভীর ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসের প্রতিফলন। এবার দুর্গাপুজোয় (DURGAPUJA 2025) ভবানীপুর মুক্ত দল (Bhawanipore Mukta Dal) এই গোমিরা নৃত্য ও শিল্পীদের জীবনযাপন তুলে ধরল মানুষের জন্য।

কুশমণ্ডি এলাকার কারিগররা এই মুখোশ তৈরি করেন, যা গামারি কাঠ দিয়ে তৈরি এবং সম্প্রতি জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (GI) ট্যাগ পেয়েছে। গোমিরা উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য। এই নাচের প্রচলন মূলত গ্রামীণ সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা যায়, যেখানে গ্রামবাসীরা দেব-দেবী ও পৌরাণিক চরিত্রগুলির মুখোশ পরে নৃত্য পরিবেশন করেন।
এই মুখোশগুলো সাধারণত লাল, নীল ও সাদা রঙের হয় এবং লোককথার বিভিন্ন চরিত্র, যেমন— মহিষাসুর, হনুমান, এবং দেবদেবীদের প্রতিনিধিত্ব করে।

গোমিরা নৃত্য একটি ধর্মীয় আখ্যানের অংশও বটে। এটি গ্রাম থেকে অশুভ শক্তি দূর করে শুভ শক্তিকে আহ্বান করার একটি রীতি। নৃত্যটি সাধারণত উৎসবের সময় পরিবেশিত হয় এবং এর মাধ্যমে স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেদের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। এই নাচে একক বা দলবদ্ধভাবে নৃত্য পরিবেশিত হতে পারে। মুখোশ ছাড়াও নৃত্যশিল্পীরা সুন্দর পোশাক পরে থাকেন, যা তাঁদের চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে।
নিৎসে বলেছেন, 'আমি শুধু সেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করব, যিনি নাচতে জানেন...।' উওর দিনাজপুরের নিভৃত জনপদে গোমীরা মুখোশের অন্তরালে দেবতারা জেগে ওঠেন রক্তমাংসের মানুষের শরীরে! লম্ফ ঝম্প দিয়ে মা দুর্গা বধ করেন মহিষাসুরকে! কালী ছুটে যান দৈত্যদলনে; গণেশ করেন বিঘ্ননাশ; রাবণ বধ হন রামের হাতে।

অথচ সেই দেবতার মুখোশের আড়ালেই এই যে মানুষগুলি আসর মাতান তাঁদের নাচের মাধ্যমে, সেই নাচের পরিবর্তে তাঁরা পান যৎসামান্য মূল্য। পুজো কমিটির বক্তব্য, "আমরা কখনও জানতেও পারি না, সেই গণেশ, কালী, দুর্গা, রাম আর অসুরের আড়ালে তাঁদের কারা জীবন্ত করে তুলেছিলেন। জানতেও পারি না সেই মানুষগুলির নাম, যাঁরা আমাদের পুরাণের চরিত্রগুলিকে প্রাণবন্ত করে তোলেন আমাদের সামনে।
দেবতার অন্তরালে এ যেন এক দৈবাহতের আর্ততাণ্ডব! এক লুপ্তপ্রায় শিল্পকে জিইয়ে রাখার অন্তিম উপস্থাপনা। সেই গোমীরার কথাই তুলে ধরল ভবানীপুর মুক্ত দল।