দুর্গাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন হলেও, মায়ের মর্ত্যে আগমনের আসল তিথি সপ্তমী। এই দিন থেকেই দেবী আরাধনা শুরু হয়। তাই দুর্গা সপ্তমীর অবস্থান দেখেই স্থির হয় দেবীর আগমন কোন যানের মাধ্যমে হবে।

ছবি - AI
শেষ আপডেট: 25 September 2025 16:12
অপেক্ষা আর কয়েক দিনের। তারপরেই শ্রেষ্ঠ উৎসবে মেতে উঠবে বাঙালি। দরজায় কড়া নাড়ছে দুর্গাপুজো ২০২৫। শাস্ত্রমতে দেবী দুর্গার বাহন পশুরাজ সিংহ। তবে প্রতিবছর দেবীর আগমন ঘটে চার বিশেষ যানে চড়ে। দেবীর গমনও সেইভাবেই। বিশ্বাস, এর উপরই নির্ভর করে গোটা বছরটা কেমন যাবে সেই হিসাব।
বছর ঘুরে আবার মর্তে আসছেন উমা। দেবীর এই আগমন বাঙালির কাছে ঘরের মেয়ের বাপের বাড়ি ফেরার মতোই। কখনও গজ, কখনও ঘোড়া, কখনও নৌকা কিংবা পালকি—এই চার যানে চড়ে মর্তে আসেন উমা। প্রতিবছর নিয়ম করে অদলবদল ঘটে এই যানগুলির। আর সেই বদলের ভিত্তিতেই আগাম আভাস মেলে, কেমন কাটবে বছরটা।

কিন্তু এই বদল ঠিক হয় কীসের ভিত্তিতে?
শাস্ত্র বলে—
“রবি চন্দ্রে গজারূঢ়া, ঘোটকে শনি ভৌময়োঃ,
গুরৌ শুক্রে চ দোলায়াং, নৌকায়াং বুধবাসরে।”
অর্থাৎ দেবীর আগমন কোন দিনে হচ্ছে, সেই মতো ঠিক হয় বিশেষ যান। তার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে সেই বছরের ভাগ্য। শ্লোকের ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়:
সপ্তমী রবি বা সোমবার হলে দেবীর বাহন হবে গজ বা হাতি।
সপ্তমী শনি বা মঙ্গলবার হলে দেবীর বাহন হয় ঘোটক বা ঘোড়া।
সপ্তমী বৃহস্পতি বা শুক্রবার হলে দেবীর যান দোলা বা পালকি।
সপ্তমী বুধবার হলে দেবীর যান হয় নৌকা।
বলে রাখা ভালো, দুর্গাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন হলেও, মায়ের মর্তে আগমনের আসল তিথি সপ্তমী। এই দিন থেকেই দেবী আরাধনা শুরু হয়। তাই দুর্গা সপ্তমীর অবস্থান দেখেই স্থির হয় দেবীর আগমন কোন যানের মাধ্যমে হবে।
একইভাবে দশমী তিথি দেবীপূজার শেষ দিন। এই তিথির সাপ্তাহিক অবস্থান দেখে স্থির হয় মায়ের গমন কোন যানে হবে। যেমন—
দশমী যদি রবি বা সোমবার হয়, দেবীর ফেরার বাহন হয় গজ।
দশমী শনি বা মঙ্গলবার হলে দেবী বিদায় নেবেন ঘোড়ায় চড়ে।
দশমী বৃহস্পতি বা শুক্রবার হলে দেবীর গমন হবে দোলা বা পালকিতে।
দশমী বুধবার হলে দেবী নৌকায় চড়ে কৈলাসে ফিরবেন।
এ বছর কী?
এই সূত্র অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, এবছর দেবীর আগমন গজে (সপ্তমী পড়ছে সোমবার) এবং গমন হবে দোলায় (দশমী পড়ছে বৃহস্পতিবার)।

বাহনের ফলাফল কী?
শাস্ত্র বলছে—
“গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা,
ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে, দোলায়াং মড়কং ভবেৎ,
নৌকায়াং জলবৃদ্ধি শস্যবৃদ্ধিশ্চ।”
অর্থাৎ:
গজে যাতায়াত হলে পৃথিবী হবে সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা।
ঘোড়ায় যাতায়াত করলে ফল ছত্রভঙ্গ—মানুষের সম্পর্কে ভাঙন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতা।
দোলায় যাতায়াত করলে দেখা দেবে মড়ক—অকালমৃত্যু, দুর্যোগ ও দুর্ভোগ।
নৌকায় যাতায়াত করলে হবে জলবৃদ্ধি ও শস্যবৃদ্ধি, মাটির তৃষ্ণা মিটবে।
এ বছরের পূর্বাভাস
এ বছর দেবীর আগমন গজে—হাতিতে। গজ দেবীর সবচেয়ে শুভ বাহন। আগমন গজে হলে মর্তলোক ভরে ওঠে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধিতে। ভক্তদের ইচ্ছা পূর্ণ হয়, পরিশ্রমে সুফল মেলে, বর্ষণ হয় ঠিকঠাক, না অতিবৃষ্টি না অনাবৃষ্টি।
কিন্তু দেবীর গমন হবে দোলায়—পালকিতে। শাস্ত্রমতে দোলায় গমন মানে দুর্ভোগ ও দুর্যোগের ইঙ্গিত।
দেবী দুর্গাই রক্ষা করবেন
“জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী, অভয়া শক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো।”
মা দুর্গা শক্তির প্রতীক। অশুভ শক্তি নাশ করার বল প্রদান করতেই তাঁর আগমন। দুর্ভোগ, দুর্যোগ, বাধা-বিপত্তি যাই আসুক না কেন—আমাদের বিশ্বাস, মায়ের আশীর্বাদে অশুভ শক্তির পরাজয় হবেই।
চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী দশমীর দিন মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তির বিসর্জন হোক, কিন্তু আমাদের মন-মন্দিরে তাঁর শক্তিঘট চির অক্ষয় হয়ে থাকুক।
ওঁ সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ,
সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ,
সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু,
মা কশ্চিদ দুঃখ ভাবভবেত।।
ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি।।