এবারের শহিদ-সভা গত বছরের তুলনায় অন্যরকম। সময়ে নির্বাচন হলে আগামী বছর এপ্রিল মাসে বিধানসভা ভোট হবে বাংলায়। তাই একুশে মমতা ও অভিষেক যে পরিকল্পনা করে ছাব্বিশের ভোটের কৌশল ও দিশা দেখাবেন তা অনিবার্য।

মমতা-অভিষেক
শেষ আপডেট: 21 July 2025 08:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোচবিহারের দিনহাটায় বসবাস করছেন রাজবংশী সম্প্রদায়ের উত্তম কুমার ব্রজবাসী। তাঁর কাছে বৈধ পরিচয়পত্রও রয়েছে। তবু তাঁকে 'বিদেশি' তথা 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' সন্দেহে এনআরসি (NRC) নোটিশ পাঠিয়েছিল অসমের ফরেনার্স ট্রাইবুনাল। ওমনি ফোঁস করে উঠেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। মমতা বলেছিলেন, “এ হল গণতন্ত্রের উপর পরিকল্পিত আঘাত। অসমের বিজেপি সরকার কোনও সাংবিধানিক ক্ষমতা ছাড়াই বাংলায় এনআরসি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।" আর অভিষেকের কথায়, “এটা পিছনের দরজা দিয়ে বাংলায় এনআরসি চালুর অপচেষ্টা, যে রাজ্যে বিজেপি জনাদেশও পায়নি, শাসন করার নৈতিক অধিকারও নেই”। আজ ২১ জুলাইয়ের (21 July) মঞ্চে সেই উত্তম কুমার ব্রজবাসীকে হাজির করতে পারে তৃণমূল।
এবারের শহিদ-সভা গত বছরের তুলনায় অন্যরকম। সময়ে নির্বাচন হলে আগামী বছর এপ্রিল মাসে বিধানসভা ভোট হবে বাংলায়। তাই একুশে মমতা ও অভিষেক যে পরিকল্পনা করে ছাব্বিশের ভোটের কৌশল ও দিশা দেখাবেন তা অনিবার্য। পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, সেই কৌশল কী হতে পারে তা ধরা রয়েছে, ব্রজবাসীকে মঞ্চে উপস্থিত করার ছোট ছবিতেও। তাঁরা মনে করছেন, ছাব্বিশের ভোটের আগে ফের মুখ্য তৃণমূলের রাজনৈতিক ধারাভাষ্যের মূল বিষয় হয়ে উঠতে পারে দুটি—এক, বাংলা ও বাঙালির অস্মিতা ও ভিন রাজ্যে বাঙালিদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। এবং দুই—নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনের’ (Special Intensive Revision বা SIR) বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা। সেই আন্দোলনের জন্য দিল্লি চলোর ডাক দেওয়ার সম্ভাবনাও তাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
২৭ বছর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃণমূল কংগ্রেসের পত্তন করেছিলেন, তখন দলের মূল মতাদর্শই ছিল সিপিএম বিরোধিতা। একটাই লক্ষ্য ছিল—বাংলায় বাম দূর্গের পতন ঘটানো। বাংলায় সিপিএম এখন ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। তাই সিপিএম বিরোধিতার আবেগের বিষয়টি এখন দুর্বল বা অপ্রাসঙ্গিক। অথচ তা ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দলকে এক সুতোয় বেঁধে পরিচালিত করা কঠিন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভোটের আগে কৌশলগতভাবে একটি আবেগের বিষয় তাই তুলে ধরার চেষ্টা করেন তৃণমূলনেত্রী। তা হল- বাংলা ও বাঙালি। বাংলায় প্রধান বিরোধী শক্তি বিজেপি মূলত হিন্দিবলয় ও উত্তর ভারতের পার্টি বলে পরিচিত থাকায় তাতে সুবিধাই হয়েছে তাঁদের। এবং গত অন্তত দুটি নির্বাচনে দেখা গেছে, এই বাংলা ও বাঙালি বিষয়টিই বিভিন্ন মোড়কে ফিরে ফিরে এসেছে তৃণমূলের কৌশলে। যেমন একুশের ভোটে বিজেপিকে বহিরাগত বলে দেগে দিয়ে তৃণমূল দেওয়াল লিখেছিল—বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়। আর চব্বিশে কেন্দ্রের বিজেপিকে সরকারকে দেগে দিয়েছিল ‘বাংলা বিরোধী’ বলে। অভিষেকরা স্লোগান তুলেছিলেন—চব্বিশের নির্বাচন- বাংলা বিরোধীদের বিসর্জন।
বাঙালি অস্মিতার মতো কোনও বিষয় তুলে ধরা আরও একটি কারণে কৌশলগত। তা হল, বাংলায় ১৪ বছর ক্ষমতায় রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটানা এতদিন সরকারে থাকার ফলে স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। তা ঠেকানোর জন্যও বা বিতর্কের মুখ ঘোরানোর জন্যও একটা আবেগের বিষয় দরকার। যা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের দিকগুলো ঢেকে দিতে পারে।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা তৃণমূলের জন্য রাজনৈতিক ভাবে উদ্বেগেরও। বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক থেকে শুরু করে অনেকেরই এই উদ্যোগের কারণে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা বিপন্ন করে তুলতে পারে এলাকা ভিত্তিতে জোড়াফুলের নির্বাচনী সম্ভাবনা। এ বিষয়টিকেও তাই কৌশলে বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে আঘাত হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করতে পারে তৃণমূল।
এ ছাড়া পহেলগামের ঘটনার প্রসঙ্গ, বাংলার সঙ্গে অর্থনৈতিক বঞ্চনার মতো বিষয়ই একুশের মঞ্চে উঠে আসবে বলেই মনে করা হচ্ছে।