বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের ফলে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 18 August 2025 15:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে গুরুতর ভাইরাল সংক্রমণে ভর্তি হওয়া বহু রোগীর সুস্থ হতে দেরির নেপথ্যে মূলত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ। ফলে হাসপাতালে থাকার সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে, বিশেষত যখন বেড দখল হার বেশি। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক রোগী ভাইরাল ইনফেকশনের পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে ভুগছেন, যেমন streptococcal pneumonia, যাতে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করলে তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের ফলে, যা বহু ক্ষেত্রে কমিউনিটি-অ্যাকোয়ার্ড (হাসপাতালের বাইরে হওয়া কোনও ইনফেকসন) ব্যাকটেরিয়াকে বহু-ওষুধ প্রতিরোধী (multi-drug resistant) করে তুলেছে।
ডাঃ অভিজিৎ আইচ ভৌমিক (কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান, বিপি পোদ্দার হাসপাতাল) বলছেন, “এই ধরনের প্রতিরোধী সংক্রমণ চিকিৎসাকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে এবং দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার পাশাপাশি বারবার ভর্তি হতে বাধ্য করছে রোগীদের। এতে জটিলতা বাড়ছে এবং সামগ্রিক চিকিৎসার ফলাফলও খারাপ হচ্ছে। যদি এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে সাধারণ সংক্রামক রোগ মোকাবিলা করা ভবিষ্যতে ভীষণ কঠিন হয়ে উঠবে।”
চার্নক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় ১০%-১৫% ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের রোগীর শরীর প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিকে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। ইন্টারনাল মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডাঃ জয়ন্ত দত্ত জানিয়েছেন, “অনেকেই ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট ‘অ্যাটিপিক্যাল’ ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই আমাদের শুরু থেকেই বেশি ও ব্রড-স্পেকট্রাম (বহুমুখী) অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হচ্ছে।”
চিকিৎসকদের দাবি, পেনিসিলিন (penicillin), সেফালোস্পোরিন (cephalosporin), ফ্লোরোকুইনোলোন (fluoroquinolone)- এর মতো বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক এখন অনেকটাই কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ডাঃ সৌমেন পাঁজা (আরএন টেগোর হাসপাতাল) বলেছেন, “যে অ্যান্টিবায়োটিক একসময় শুধু হাসপাতালে প্রেসক্রাইব করা হতো, সেগুলো এখন ওভার-দ্য-কাউন্টার (দোকানে গেলেই প্রেসক্রিপশন ছাড়া) পাওয়া যাচ্ছে এবং তার ফলে নির্বিচারে তার ব্যবহার হচ্ছে। ফলে প্রতিরোধ তৈরি হওয়া সময়ের অপেক্ষা ছিল। কিন্তু এত দ্রুত বেড়ে যাবে, তা বোঝা যায়নি।”
পিয়ারলেস হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজিস্ট ভাস্কর নারায়ণ চৌধুরী জানিয়েছেন, হাসপাতালে পাওয়া ব্যাকটেরিয়া বেশি মাত্রায় মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট এবং এর চিকিৎসা কঠিন। তাঁর কথায়, “ভাইরাল সংক্রমণের পর ফুসফুসে যে মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ও ব্যাপকভাবে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট যে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন দেখা দিচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে কার্বাপেনেম রেজিস্ট্যান্ট ক্লেইবশিয়েল্লা নিউমোনি, অ্যাসিনেটোব্যাক্টর বাউমান্নি এবং মেথিসিলিন রেজিস্ট্যান্ট স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস (MRSA)।
চিকিৎসকদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ চিহ্নিত করতে তিন দিন পর্যন্ত সময় লাগে। এর ফলে চিকিৎসায় দেরি হয়, খরচ বাড়ে এবং রোগীরা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েন। এক বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক বলেছেন, “অত্যন্ত কার্যকরী Meropenem ওষুধ কয়েক বছর আগেও ভাল কাজ করত, কিন্তু এখন সেটিও অনেক ক্ষেত্রে কাজে লাগে না।”
আইএলএস হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান ডাঃ পিনাকী দে জানিয়েছেন, “কমিউনিটি-অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়া ও ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের মতো সাধারণ অসুখের ক্ষেত্রেও প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে। ফলে যখন প্রচলিত ওষুধ কাজ করছে না, তখন রোগীদের সুস্থ হতে দেরি হচ্ছে এবং অযথা কষ্ট বাড়ছে।”
চিকিৎসক মহলের মতে, এখন কমিউনিটি-অ্যাকোয়ার্ড সংক্রমণও হাসপাতাল-অ্যাকোয়ার্ড ইনফেকশনের মতোই প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। এর ফলে চিকিৎসার খরচ, ঝুঁকি এবং রোগীর হাসপাতালে কাটানো সময় - সবই বেড়ে চলেছে।