বাংলাদেশের ফরিদপুর থেকে দেশভাগের সময় আনা ৩০০ বছরের প্রাচীন বাসন্তী পুজো আজ দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুরে নতুন পরিচয়ে। পদ্মশ্রী সনাতন রুদ্র পালের হাতে গড়ে উঠছে দেবীর প্রতিমা, বজায় থাকছে পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্য।

৩০০ বছরের প্রাচীন বাসন্তী পুজো
শেষ আপডেট: 24 March 2026 23:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশভাগের সময়, বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) থেকে যখন পরেশ নাথ মৌলিক ভিটেমাটি ছেড়ে এপারে চলে আসেন, তাঁর সঙ্গী ছিল কেবল বংশপরম্পরায় চলে আসা দেবীঘট ও ৩০০ বছরের প্রাচীন বরাহোদন্ত নারায়ণশিলা। ফরিদপুরের সেই মৌলিক পরিবারের আভিজাত্য আর ভক্তি আজ ঠাঁই করে নিয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুর লেবুতলায়।
এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ হল এর প্রতিমার কাঠামো। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মূর্তির আদল থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা। পূর্ববঙ্গের প্রাচীন রীতি মেনে এখানে সরস্বতীর পাশে স্থান পান গণেশ (বাম দিকে) এবং লক্ষ্মীর পাশে থাকেন কার্তিক (ডান দিকে)। শুধু তাই নয়, কলাবউ স্নান শেষে অবস্থান করেন কার্তিকের পাশে, মায়ের ঠিক ডান দিকে। এবার এই অপরূপ মূর্তিকে রূপদান করছেন খোদ পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত প্রখ্যাত শিল্পী সনাতন রুদ্র পাল।

মৌলিক বাড়ির পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘মাছ ভোগ’। নবমীর হোম শেষে দেবীকে অর্পণ করা হয় প্রায় ৯ কেজি ওজনের বোয়াল মাছের ভোগ। আবার বিজয়া দশমীর দুপুরে পান্তা ভাত আর কচু শাকের সঙ্গে পুঁটি মাছ থাকা একান্ত আবশ্যক— যা নিখাদ পূর্ববঙ্গীয় ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। ভক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যের এই মিশেলই পুজোর দিনগুলিতে রাজপুরকে ফরিদপুরের পুরনো সেই স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
বর্তমানে স্বর্গীয় পরেশ নাথ মৌলিকের পৌত্র দেবমাল্য মৌলিক এই পুজোর গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। গত কয়েক বছরে এই পারিবারিক পুজো এক বিশাল সামাজিক রূপ নিয়েছে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় থেকে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, কৌশিক গাঙ্গুলী থেকে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়— বিনোদন জগতের নক্ষত্ররা যেমন এই বাড়ির প্রাঙ্গণে উপস্থিত থাকেন, তেমনই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো।
বংশানুক্রমিক এই ঐতিহ্য নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের প্রতিনিধি দেবমাল্য মৌলিক বলেন, "বাসন্তী পুজো আমাদের পরিবারের ডিএনএ-তে মিশে আছে। ৩০০ বছরের এই ধারাকে বাংলাদেশের ফরিদপুর থেকে এপারে নিয়ে এসে আজও ধরে রাখতে পারাটা আমাদের কাছে এক অকল্পনীয় আনন্দের এবং তৃপ্তির। এটি কেবল আমাদের পরিবারের নয়, রাজপুরবাসীর উৎসব হয়ে উঠেছে।" ফাল্গুনের শেষে আর চৈত্রের শুরুতে যখন বাসন্তী পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ে, তখন রাজপুর লেবুতলার এই বাড়িটি আর পাঁচটা সাধারণ বাড়ির মতো থাকে না; তা হয়ে ওঠে ছিন্নমূল বাঙালির এক টুকরো শেকড়ের আখ্যান।