৪৭ বছর আগের সেই ভয়াবহ বন্যা! ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে ডুবে গিয়েছিল কলকাতা ও গোটা দক্ষিণবঙ্গ। লক্ষাধিক গৃহহীন, হাজার হাজার প্রাণহানি।
.jpeg.webp)
৪৭ বছর আগের সেই ভয়াবহ বন্যা!
শেষ আপডেট: 23 September 2025 16:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সোমবার রাতে কলকাতায় মাত্র ৫ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার। এ কথা বললে, অনেকেই এই ভয়বহতা আন্দাজ করতে পারবেন না। পুরসভার যে নিকাশী পাইপ রয়েছে তা নিয়ে ঘণ্টায় মাত্র ২০ মিলিমিটার বৃষ্টির জল খালে ফেলতে পারে। এতেই বোঝা যাচ্ছে, কলকাতা ডুবে যাওয়ার কারণটা। যা দেখে অনেকেই ৭৮ সালের বন্যার (1978 Kolkata Flood) স্মৃতি হাতড়াতে শুরু করেছেন।

এখন যাঁদের বয়স ৫০। তাঁদেরও সেই বৃষ্টির স্মৃতি ফিকে। কিন্তু প্রবীণদের অনেকেই সেই ভয়াবহ বৃষ্টির কথা এখনও ভোলেননি। তা ভোলেননি কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। এদিন বৃষ্টির জল বের করতে নাকাল মেয়রও বলেন, ৭৮ সালের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
কিন্তু কী ঘটেছিল ৭৮ সালে? ফিরে দেখা যাক। নীচে ৭৮ সালের বন্যার ভিডিও রইল ( 1978 Kolkata Flood Video)।
১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে, দুর্গাপুজোর ক’দিন আগে, কলকাতা ও গোটা দক্ষিণবঙ্গ সাক্ষী হয়েছিল এক ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের। ইতিহাস বলছে, একটানা বৃষ্টিতে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল শহরে। কলকাতার রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি—সব কিছুই ডুবে গিয়েছিল জলস্রোতে। সেই ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি আজও বাঙালির কাছে গা ছমছমে এক অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
শহর কলকাতার অবস্থা
২৫ সেপ্টেম্বর রাত থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়। রাতভর চলা ঝড়-বৃষ্টির পর সকালেই দেখা যায়, শহরের গলিপথ থেকে বড় বড় রাস্তাঘাট, সব জায়গাতেই হাঁটু থেকে কোমর জল জমে গিয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল নাগাদ প্রধান সড়কগুলিতে ২ ফুটেরও বেশি জল। লোকাল ট্রেন চলাচল স্তব্ধ, ট্রাম-বাস ডুবে অচল। কলকাতার বুকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বহু এলাকা।
বৃষ্টির জেরে শুধু কলকাতাই নয়, হাওড়া, হুগলি, বাঁকুড়া, নদিয়া, মেদিনীপুর ও মুর্শিদাবাদ জেলার বড় অংশ জলের তলায় চলে যায়। কলকাতা বন্দরে নোঙর করা জাহাজগুলিও ঝড়-বৃষ্টির কবলে নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
শুধু বসতি এলাকা নয়, বন্যার জেরে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পাঞ্চলেও তীব্র প্রভাব পড়ে। দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট, বার্নপুরের আইআইএসসিও কারখানা, পার্শ্ববর্তী কয়লাখনি এলাকা সবই ডুবে যায় বৃষ্টির জলে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলি একের পর এক বন্ধ হয়ে পড়ে, হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে যায়।
অভূতপূর্ব বৃষ্টিতে দামোদর নদে জল-ছাড় পরিমাণ একসময়ে ৭.৫ লক্ষ কিউসেক ছাড়িয়ে যায়, অথচ বাঁধের মাধ্যমে বের করা সম্ভব হয়েছিল মাত্র এক লক্ষ কিউসেক জল। ফলে দামোদরের পাঁচটি উপনদী একসঙ্গে ফুঁসে ওঠে। এই প্রবল জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে দেয় নদীর দুই পাড়ের বিস্তীর্ণ জনপদ। জলস্তর কোথাও কোথাও ১৮ ফুট পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।
সরকারি হিসেব আর বাস্তবের ফারাক আজও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সরকারি হিসেবে রাজ্যজুড়ে নিহতের সংখ্যা কম দেখানো হলেও, শুধু মেদিনীপুর জেলাতেই প্রায় ১৫,০০০ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল বলে অনুমান। গোটা রাজ্যে এক কোটিরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। পরের কয়েকদিনে খাদ্যাভাব, অপুষ্টি ও রোগবালাই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
প্রতিটি জেলা জুড়ে খাদ্যের জন্য হাহাকার শুরু হয়। নদিয়া জেলার মায়াপুরে আইএসকন কেন্দ্র ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করে। ভাঙাচোরা নৌকোয় চেপে ৮ ঘণ্টা ধরে গঙ্গার উত্তাল স্রোত পেরিয়ে একদল সন্ন্যাসী পৌঁছে দেন ৪ হাজার কেজি চাল। ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ি হারানো মানুষ আশ্রয় নেন মন্দির ও স্কুলবাড়ির দোতলা-তিনতলায়। ছেঁড়া কাপড়, অনাহারে থাকা শিশু, আর্তনাদের শব্দে ভরে ওঠে গ্রামবাংলা।
দিনপঞ্জির মতো লেখা অনেক বিবরণে উঠে এসেছে মানুষের অসহায়তার চিত্র—২৭ সেপ্টেম্বর: জলস্তর দাঁড়ায় ৫ ফুটে, গবাদি পশুদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লড়াই করতে হয় স্রোতের সঙ্গে। ২৮ সেপ্টেম্বর: রাস্তায় জল ১০ ফুট, গ্রাম ভেসে যায়। ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় করে গ্রামের মানুষ আশ্রয় নেন ইস্কনের ভবনে। ২৯ সেপ্টেম্বর: বৃষ্টি থামলেও জল বাড়তে থাকে। বিষাক্ত সাপের উপদ্রব শুরু হয়। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে: ভেসে যাওয়া গ্রামগুলিতে খিচুড়ি, গম, দুধগুঁড়ো, ডাল পৌঁছে দেওয়া হয় নৌকোয় চেপে।
জল নামতে শুরু করার পর নতুন বিপর্যয় দেখা দেয়। চারদিকে শুরু হয় কলেরা, টাইফয়েড ও বসন্তের প্রাদুর্ভাব। গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসার অভাব পরিস্থিতিকে আরও মারাত্মক করে তোলে। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিঃস্ব হয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাতে থাকেন।
১৯৭৮ সালের এই বন্যা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক অধ্যায়। দুর্গাপুজোর আনন্দ মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মানুষের জীবন। আজও সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—নগর পরিকল্পনায় বৃষ্টির জল বের করার সুব্যবস্থা কতটা জরুরি, নদী নিয়ন্ত্রণে বাঁধের সক্ষমতা বৃদ্ধি কতটা অপরিহার্য, এবং জরুরি অবস্থায় ত্রাণ ব্যবস্থার দ্রুততা মানুষের জীবন বাঁচাতে কতখানি কার্যকর।
১৯৭৮ সালের বন্যা কেবলমাত্র এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি ছিল মানুষের অসহায়তা, ক্ষুধা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের ইতিহাস। একদিকে নদী ও বৃষ্টির উন্মত্ত রূপ, অন্যদিকে মানুষে মানুষে সাহায্যের হাত—এই দুই মিলে গড়ে উঠেছিল এক বেদনাদায়ক অথচ মানবিক অধ্যায়। দুর্গাপুজোর মুখে প্রবল বৃষ্টির পূর্বাভাস শুনে অনেকেই তাই শিউরে উঠছেন—মনে পড়ে যাচ্ছে ১৯৭৮-এর সেই ভয়ঙ্কর দিনের কথা।