বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন কবি, আবৃত্তিকার এবং বিশিষ্টজনেরা। মুখ্যমন্ত্রীকে একটি খোলা চিঠি লিখে তাঁরা এই তদন্ত করবার জন্য দাবি তুলেছেন।

কবিতা উৎসব বন্ধ।
শেষ আপডেট: 28 May 2025 18:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বন্ধ হয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গ কবিতা আকাদেমি আয়োজিত কবিতা উৎসব। গত বছর এই উৎসব আয়োজিত হয়েছিল জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে। সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যেই এই উৎসবটি আয়োজিত হয়ে থাকে। এবছর সকলেই আশা করেছিলেন মার্চ মাসে এই উৎসবটি আয়োজিত হবে। কিন্তু, কবিতা আকাদেমির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠায় সরকারের তরফ থেকেই এই কবিতা উৎসবটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
কবিতা আকাদেমির এই কবিতা উৎসবটিতে স্বজনপোষণ হয় এইরকম একটি অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছিলেন সাধারণ মানুষ। বিশিষ্ট কিছু কবিদের এই উৎসবে ধারাবাহিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয় না এমন অভিযোগও করেছেন কবিদের কেউ কেউ। সূত্রের খবর এবার সরকারের কাছে যে-অভিযোগগুলি জমা পড়েছে তা আরও মারাত্মক।
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কবিতা আকাদেমির সভাপতি সুবোধ সরকারের ঘনিষ্ঠ এক কবি বিভিন্ন আবৃত্তির দলের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নিয়েছেন সেই দলগুলিকে কবিতা উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে, উঠেছে এমন গুরুতর অভিযোগও।
সেই সঙ্গেই অভিযোগ উঠেছে যে, এই কবিতা উৎসবে সুযোগ পেতে গেলে সভাপতি সুবোধ সরকারের কবিতা আবৃত্তি করা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ কবি ও আবৃত্তিকারদের একাংশ এও অভিযোগ করেছেন যে, আকাদেমি প্রদত্ত পুরস্কারগুলিও বেছে বেছে সেই সমস্ত কবিদেরই দেওয়া হয় যারা সভাপতি এবং কবিতা আকাদেমির কোর কমিটিতে থাকা দু’একজন আবৃত্তিকারের ঘনিষ্ঠ।
কবি কালীকৃষ্ণ গুহকে এই বিষয়গুলি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “কবিতা আকাদেমি-র মতো প্রতিষ্ঠান কেন তৈরি করা হয়েছে তাই বোধগম্য নয় যেখানে বাংলা আকাদেমি রয়েছে যা বস্তুত এই রাজ্যের সাহিত্য আকাদেমি। যে জমানায় লক্ষ লক্ষ টাকা গরিব চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং তা ধরা পড়ার পর –হাজার হাজার যুবকযুবতীর সর্বনাশের পর –সরকার টিকে থাকে সেই জমানায় মঙ্গলজনক কোনো-কিছু প্রত্যাশা করার থাকে না।”
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন কবি, আবৃত্তিকার এবং বিশিষ্টজনেরা। মুখ্যমন্ত্রীকে একটি খোলা চিঠি লিখে তাঁরা এই তদন্ত করবার জন্য দাবি তুলেছেন। এই চিঠিতে তাঁরা লিখেছেন, “ভারতবর্ষের মাত্র একটি রাজ্যেই আপনার উদ্যোগেই পশ্চিমবঙ্গ কবিতা আকাদেমি স্থাপিত হয়েছিল। এই আকাদেমির কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কবি এবং আবৃত্তিকারদের মধ্যে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমেও খবর প্রকাশ পেয়েছে, যাতে জানানো হয়েছে যে, এই কবিতা আকাদেমি আয়োজিত কবিতা উৎসবটি এ বছর বন্ধ হয়ে গেছে আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায়।
কবিতা আকাদেমির পরিচালন কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন যে, এই আকাদেমির শেষ মিটিংটি হয়েছিল গত বছর (২০২৪) জুন/জুলাই মাস নাগাদ। এটিও একটি আকাদেমির পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।
পশ্চিমবঙ্গ কবিতা আকাদেমি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আমরা চাইছি, আকাদেমির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হোক যাতে ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গ কবিতা আকাদেমির কবিতা উৎসব সহ আরও নানা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে। আবারও একটি সরকার পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় আমরা বিচলিত। আশা করব আমাদের দাবিতে সাড়া দিয়ে আপনি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন”।
চিঠিতে সই করেছেন পবিত্র সরকার, সৌরীন ভট্টাচার্য, মালিনী ভট্টাচার্য, শ্যামলকান্তি দাস, শংকর চক্রবর্তী, একরাম আলি, নির্মল হালদার, গৌতম চৌধুরী, প্রবীর ব্রহ্মচারী, রজত বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্দাক্রান্তা সেন, অংশুমান কর সহ প্রায় ৬০ জন কবি, আবৃত্তিকার, বুদ্ধিজীবীরা। এবার দেখার এই অভিযোগগুলি নিয়ে সরকার কবিতা আকাদেমির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয় কিনা।
তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে জানুয়ারি মাসে শেষবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছিল কবিতা উৎসব। প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়া রেওয়াজ। কিন্তু চলতি অর্থবর্ষে আর সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকল না।
সব মিলিয়ে, সাহিত্য ও আবৃত্তি জগতে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা একাধিক অভিযোগ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। এক প্রবীণ কবি কয়েক বছর আগেই অ্যাকাডেমির পুরস্কার বিতরণে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নাকি এই নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলেও জানিয়ে দেন। অনুমান করা হচ্ছে, এমন কেউই প্রশাসনিক স্তরে অভিযোগ জানিয়ে থাকতে পারেন, যার জেরে বন্ধ হয়ে গেল উৎসব। যদিও অফিসিয়ালি এ নিয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি নন। অ্যাকাডেমির সভাপতি সুবোধ সরকারও প্রকাশ্যে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানাননি। তাঁকে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। তাঁর তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে এই প্রতিবেদনে আপডেট করা হবে।