মণিপাল রোবোটিক স্পাইন সার্জারিতে পশ্চিমবঙ্গের ৫৭৪ জন ফিরে পেয়েছেন স্বাভাবিক মেরুদণ্ড। শিশু থেকে বৃদ্ধ— সকলেই যেন নতুন জীবনে প্রবেশ করেছেন।

ডক্টর এস বিদ্যাধর।
শেষ আপডেট: 28 May 2025 16:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রোবোটিক প্রযুক্তির অগ্রগতির হাত ধরে চিকিৎসাক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে ভারত। তারই অন্যতম উদাহরণ, বেঙ্গালুরুর মণিপাল হাসপাতাল। এখানকার রোবোটিক স্পাইন সার্জারি ইউনিটে (MIRSS) গত দু’বছরে হাজারেরও বেশি সফল রোবোটিক স্পাইন সার্জারি হয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই এসেছেন ৫৭৪ জন রোগী। সুস্থ ও সক্ষম হয়ে বাড়ি ফিরেছেন তাঁরা।
রোবোটিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই স্পাইন সার্জারিগুলি এতটাই নির্ভুল এবং নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয় যে, রোগীরা সাধারণ সার্জারির চেয়ে অনেক দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ— যে কোনও বয়সের মানুষ এই চিকিৎসার সুফল পেয়ে চলেছেন প্রতিদিন।
এই বিপ্লবের অন্যতম পুরোধা, ডক্টর বিদ্যাধর এস। এদেশের রোবোটিক স্পাইন সার্জারির অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। তাঁরই নেতৃত্বে MIRSS আজ দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্পাইন সেন্টার।
মণিপাল সূত্রে রোগভেদে স্পাইনাল সমস্যার যে পরিসংখ্যান মিলেছে তা হল, ১৮ বছরের নীচে যে ১৬ জনের সার্জারি হয়েছে সেখানে, তার মধ্যে ৯০% ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের বিকৃতি দেখা গেছিল। কিছু ক্ষেত্রে তা ছিল জন্মগত, কিছু ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা বেড়েছে। এর পরবর্তী ধাপে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সি যে ১২৪ জনের সার্জারি হয়েছে, তার মধ্যে ডিস্ক হার্নিয়েশনের সমস্যা ছিল ৬৫% রোগীর, ২০% ভুগেছিলেন সংক্রমণে এবং টিউমার হয়েছিল ১৫% ক্ষেত্রে। ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সি ৩৫৬ জন রোগীর মধ্যে ডিস্ক হার্নিয়েশন ছিস ৫০% রোগীর, লাম্বার ক্যানাল স্টেনোসিস হয় ২৫%-এর, সংক্রমণ ১৫%-এর এবং টিউমার ধরা পড়ে ১০% রোগীর। আবার ৬০-এর ঊর্ধ্বে ৭৮ জন প্রবীণ রোগীর মধ্যে ৭৫% ক্ষেত্রে ক্যানাল স্টেনোসিস ও ডিফর্মিটি ছিল, ১০% কমপ্রেশন ফ্র্যাকচার এবং ১৫% সংক্রমণ বা টিউমার ধরা পড়ে।

MIRSS-এর সর্বাধিক রোগী এসেছেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে। এঁদের মধ্যে থেকেই উঠে এসেছে কিছু অসাধারণ গল্প, যা এই চিকিৎসা পদ্ধতির সাফল্য তুলে ধরে। যেমন সোদপুরের বাসিন্দা মেঘা বিশ্বাস। স্কুলব্যাগ বইতে কোমরে অসহ্য ব্যথা হতো কিশোরী মেঘার। ছুটোছুটি বা খেলাধুলা কিছুই করতে পারত না। মণিপাল হাসপাতালে ডক্টর বিদ্যাধরের কাছে রোবোটিক সার্জারির পর এখন পুরোপুরি ফিট ১৪ বছরের মেঘা।
কলকাতার বাসিন্দা, পেশায় ব্যাঙ্কার অভিজিৎ সরকার আবার দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে পারতেন না, স্লিপ ডিস্কের ব্যথায় ওষুধ খেতে হতো নিয়মিত। একসময় এমন হয়ে দাঁড়ায়, অফিস বন্ধ রাখতে হয় ব্যথার চোটে। এখন সার্জারির পরে সম্পূর্ণ সুস্থ, এবং সার্জারির পরের দিনই বাড়ি ফিরেছেন।
রায়গঞ্জের উত্তম ঘোষ মেরুদণ্ডের ব্যথায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। ভাবেননি, কোনওদিন আবার উঠে দাঁড়াতে পারবেন। মণিপালে সার্জারির পরে এখন আগের মতোই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। ফুটবল খেলাও আর বাধা নয় তাঁর কাছে।

বাংলার রোগীদের সঙ্গে ডক্টর এস বিদ্যাধর।
তাঁদের কাছে মণিপালের ডক্টর এস বিদ্যাধর যেন স্বয়ং ঈশ্বর-স্বরূপ। হেঁটেচলে বেড়ানোর আশা ছেড়ে দেওয়ার পরে, ছোটবেলা থেকে বাঁকা মেরুদণ্ড নিয়ে অনেক সমস্যাক মুখোমুখি হওয়ার পরে যখন ডাক্তারবাবু তাঁদের আশা দেখিয়ে বলেছিলেন, এক দিনের মধ্যে জীবনটা বদলে যাবে, তখন সেই আশ্বাসের সবটা তাঁরা বা তাঁদের পরিবার বিশ্বাস করতে পারেননি। তবে তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন ডাক্তারবাবুর দক্ষতা ও পারদর্শিতাকে। তার পরে কেবল একটা দিনের অপেক্ষা, জীবনটাই বদলে যায় তাঁদের।
মণিপাল হাসপাতালের রোবোটিক স্পাইন সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিভাগীয় প্রধান, ডক্টর এস বিদ্যাধর কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে এসে এ বিষয়ে বললেন, ‘মেরুদণ্ডের যে কোনও সমস্যা নিয়ে মানুষকে আরও সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে স্কোলিওসিস অর্থাৎ বাঁকা মেরুদণ্ড নিয়ে মানুষকে আরও সহজ হতে হবে। এটা কোনও ‘disability’ নয়, এটা একটি ‘deformity’, যা প্রথম অবস্থায় ধরা পড়লে ওষুধ, ব্যায়াম, বেল্টেই সেরে যায়। পরে হলে সার্জারি করতে হয়, এবং সেটিও আজ অত্যন্ত সহজ ও নিরাপদ।’

তিনি আরও বলেন, ‘ছোটদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়েরা অনেক সময় লজ্জায় চিকিৎসা করাতে চান না। কিন্তু লোকলজ্জার ঊর্ধ্বে উঠে, শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য এটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা উচিত মা-বাবাদের। সময় থাকতে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। বাচ্চাদের স্কোলিওসিস সার্জারি অত্যন্ত সহজ, সফলতাও অনেক বেশি।’
তিনি সতর্ক করে করেন, যে কোনও মানুষ যদি তিন মাসের বেশি মেরুদণ্ডে ব্যথা অনুভব করেন, বা হাত-পা দুর্বল হয়ে যায়, কিংবা প্রস্রাব ত্যাগে সমস্যা হয়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।