দ্য ওয়াল ব্যুরো: চোরাশিকার। শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক গা ছমছমে জঙ্গল। সেখানেই অস্ত্র হাতে নিঃশব্দে ঘুরছে একদল দুর্বৃত্ত, অন্যায় ভাবে প্রাণীদের মারছে তারা। কেটে নিচ্ছে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। সব মিলিয়ে, এ যে খুবই নৃশংস ও অনৈতিক একটা কাজ, তা নিয়ে একমত হবেন অনেকেই। তবে বিশ্বজুড়ে এত আইন ও শাস্তি হওয়া সত্ত্বেও চোরাশিকার এখনও বন্ধ হয়নি। একদল লোভী ও বেপরোয়া মানুষের জন্য আজও বিপন্ন বহু বন্যপ্রাণ। চোখের আড়ালে, গোপন সূত্রে এখনও চলছে শিকার, প্রতিদিন বিশ্বের নানা প্রান্তে কেনাবেচা হচ্ছে কয়েক কোটি টাকার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।
কিন্তু এ তো গেল গোপন অপরাধ। শুনলে চমকে উঠতে হয়, হাতির দাঁতের মতো দুর্লভ জিনিস বিক্রি হচ্ছে এখনও, তাও আবার খোলা বাজারে। সকলের চোখের সামনে সাজানো রয়েছে পসরা, বিক্রিও হচ্ছে সেগুলি নিয়মিত। সম্প্রতি এমনই অভিযোগ উঠেছে, ই-কমার্স ওয়েবসাইট 'ইবে'র বিরুদ্ধে। জানা গেছে, জাপানি ভাস্কর্য 'নেৎসুকে' নাম দিয়ে সেখানে বিক্রি হচ্ছে, হাতির দাঁতের তৈরি জিনিস। এর আগে একাধিক বার ইবে-কে সতর্ক করা হলেও তারা কথা শোনেনি।

তথ্য বলছে, ২০২০ সালেরই ডিসেম্বরে ইবে-তে দুটি ছোট ভাস্কর্য বিক্রি হয়েছে। একটি হল, ছোট্ট পাখি উঁকি মাড়ছে ডিমের খোলস ভেঙে, আর অন্যটা হল, এক জাপানি মানুষ জাপানি পোশাক পরে একটি ইঁদুরকে কাঁধে নিয়ে বসে আছেন। তথ্য বলছে, পাখির ডিমটি বিক্রি হয়েছে ১৯৫ ডলার এবং অন্যটি বিক্রি হয়েছে ১৩৪৫ ডলারের বিনিময়ে। এই দুটি জিনিসই হাতির দাঁতের তৈরি জিনিস বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের গায়ের লম্বাটে দাগ ও রঙ সে কথাই প্রমাণ করে।

আমেরিকার কেন্ট শহরের ডারেল ইনস্টিটিউট অফ কনজার্ভেশন অ্যান্ড ইকোলজি-র অধ্যাপক এবং বন্যপ্রাণ বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ডেভিড রবার্টস ও তাঁর ছাত্রী সোফিয়া ভেনতুরিনি সম্প্রতি একটি পেপার পাবলিশ করেছেন, হাতির দাঁতের বেআইনি ব্যবসার কথা লিখে। তাঁরা সেখানে বিশ্বজোড়া বহু অপরাধের কথা লিখেছেন, লিখেছন প্রতিকারের কথা। সেখানেই ইবে ওয়েবসাইটকে কাঠগড়ায় তুলেছেন তাঁরা। জানিয়েছেন, এই সংস্থাকে বারবার বারণ করা সত্ত্বেও তারা নিয়মিত হাতির দাঁতের তৈরি জিনিস বিক্রি করে চলেছে। যাতে সাদা চোখে ধরা না পড়ে, সে জন্য তারা মেটেরিয়ালের নাম উল্লেখ করে না। কখনও লেখে গরুর হাড়ের তৈরি, কখনও বা অন্য কিছু। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ঠিকই বোঝেন কোনটা কীসের তৈরি।

তাঁরা বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন জাপানি ভাস্কর্য নেৎসুকের কথা। নেৎসুকে হল, হাতির দাঁতের তৈরি ছোট্ট ভাস্কর্য। জাপানে সপ্তদশ শতাব্দীতে এই জিনিসটি ব্যবহার করা শুরু হয়, পোশাকের দড়ির শেষপ্রান্তে বাঁধার জন্য। যাতে দড়িটি ঝুলে থাকে এবং দেখতে ভাল লাগে। অনেক সময়ে কোমরের বেল্টেও গুঁজে রাখা হতো, দেখতে ভাল লাগার জন্যই। ট্র্যাডিশনাল জাপানি ফ্যাশনের এক অপরিহার্য জিনিস এই নেৎসুকে। এখন সে জায়গায় ব্যবহার করা হয় এমনিই কাপড়ের বা ধাতুর তৈরি ছোট কোনও জিনিস। তা সত্ত্বেও, আসল হাতির দাঁতের তৈরি নেৎসুকের বাজার এখনও আছে।

আর সে জন্যই ২০১৮ সাল থেকে এপর্যন্ত মোট ৩২১৪টি এই নেৎসুকে বিক্রি হয়েছে কেবল ইবে-তে! সেগুলির মধ্যে সব ক'টি না হলেও, অনেকগুলিই আসল হাতির দাঁতেরই তৈরি বলে জানা গেছে। চড়া দামে সেগুলি কিনে নিয়েছেন সংগ্রাহকরা। ডেভিড রবার্টস ব্যাখ্যা করেছেন, জিনিসগুলির গায়ের লম্বা লম্বা দাগ দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, সেগুলি হাতির দাঁতের তৈরি। এই টেক্সচার হাতির দাঁতেই হয়।

কো-অথার সোফিয়া ভেনতুরিনি লিখছেন, "এখনও পর্যন্ত ই-কমার্স সাইট ইবে-তে গিয়ে এখনও নেৎসুকে বলে টাইপ করলে হাতির দাঁতের জিনিস মিলবে। আমি দেখতে পাচ্ছি, গত কয়েক বছরে কিছুই বদলায়নি। এই ইবে-কে এর আগেও বহুবার সতর্ক করা হয়েছে, কিছুদিনের জন্য জিনিসগুলি তারা সরিয়ে নেয়, আবার কিছুদিন পরে যে কে সেই।" সত্যিই তাই। ইবে সাইটে গিয়ে টাইপ করতেই খুলে যায় নেৎসুকের ভাণ্ডার। কোনটা কী দিয়ে তৈরি উল্লেখ করা আছে সেখানে। কিন্তু সেগুলির মধ্যেই কোনটা যে হাতির দাঁতের, তা খালি চোখে ধরা মুশকিল সাধারণ মানুষের পক্ষে।

বন্যপ্রাণ বিষয়ক পরিসংখ্যান বলছে, শুধু হাতির দাঁতের জন্য বছরে প্রায় ১৫ হাজার আফ্রিকান দাঁতাল খুন করা হয়। আর এই সংখ্যা যে কমছে না, তার প্রমাণ নিয়মিত আইভরি-ভাস্কর্য বিক্রি হতে থাকা।
ইবের তরফে এ বিষয়ে দাবি করা হয়েছে হয়েছে, বন্যপ্রাণ রক্ষায় তারাও উদ্যোগী। এমনকি তারা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফেডারেশনের (ডব্লিউডব্লিউএফ) সঙ্গে হাতও মিলিয়েছে। তাদের বক্তব্য, এই বিষয়টির দিকে নজর দিয়ে তারা গত দু'বছরে আড়াই লক্ষেরও বেশি আইটেম তাদের পসরা থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে আইভরি বিক্রি হচ্ছে এখনও। অনেকে বলছেন, এই বন্যপ্রাণ রক্ষার সচেতনতা আসলে চোখে দুলো দেওয়া ছাড়া কিছুই নয়। কেউ যাতে সহজে আঙুল তুলতে না পারে, তাই তারা আগেই নিজেদের বন্যপ্রাণ-প্রেমী বলে দেখাতে চাইছে। এর আড়ালে তারা আসলে আরও বেশি করে এই কুকীর্তি করছে।