চৈতালী চক্রবর্তী
চাঁদের দক্ষিণ মেরু অভিযানের এই জার্নিটা মোটেও সহজ কাজ নয়, ইসরো যদি সফল হয় মহাকাশ গবেষণার এক নতুন দিগন্ত খুলে যাবে, ফোনের ওপারে শুরুটা ঠিক এ ভাবেই করেছিলেন
বেঙ্গালুরুর রমন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, গবেষক বিমান নাথ। নিজেকে যদিও অধ্যাপক বলতেই পছন্দ করেন বিমান বাবু, তবে তাঁর আরও একটা পরিচয় আছে। তিনি রবীন্দ্র পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ। মহাকাশ গবেষণা নিয়ে তাঁর একাধিক বই রয়েছে। চন্দ্রযান ২ চাঁদের পথ ধরে এখন প্রায় লক্ষ্যের মুখোমুখি। ঝপ করে চাঁদের মাটি ছোঁয়ার অপেক্ষায়। এই অভিযানের অনেক অজানা দিক
‘দ্য ওয়াল’-এর কাছে তুলে ধরলেন তিনি।
খুবই খরচসাপেক্ষ যাত্রা, নামার আগের প্রতিটা মুহূর্ত রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা
[caption id="attachment_139267" align="alignleft" width="183"]
বিমান নাথ[/caption]
‘‘একজন জ্যোতির্বিদ হিসেবে আমি বলতে পারি, চাঁদে যাওয়ার তোড়জোড় খুব একটা সহজ কাজ নয়। ইসরোতে আমার অনেক সহকর্মী, বন্ধুরা জানিয়েছেন, একটা মহাকাশযান তৈরি করতেই যে খরচ হয় সেটা আকাশছোঁয়া। তার উপর মহাকাশে সেই রকেট পাঠিয়ে কন্ট্রোল করাটাও ঝক্কির ব্যাপার,’’ জ্যোতির্বিদ বিমান নাথ বললেন, চন্দ্রাভিলাষ অনেকটা স্বপ্নাভিলাষেরই মতো। যদি সফলতা পাওয়া যায়, তাহলে বিশ্বজয় হবে। কারণ চাঁদে নামার আগের প্রতিটা মুহূর্ত চন্দ্রযানকে আগলে রাখতে হচ্ছে শিশুর মতোই। এর পরের বিষয়, চাঁদের মাটিতে ল্যান্ডার বিক্রমকে নামানো। লুনার সারফেস বা চাঁদের মাটিতে ল্যান্ডারের পালকের মতো নেমে আসাটা ‘সফট ল্যান্ডিং’ (Soft Landing) যথেষ্টই ঝক্কির ব্যাপার।সামান্য ভুল, কয়েক সেকেন্ডের অসর্তকা, প্রায় হাজার কোটির এই প্রকল্পকে লহমায় তছনছ করে দিতে পারে।
সবাই বলছে বরফের খোঁজ একটা বড় ব্যাপার, চাঁদের নামার পরেই সেটা বোঝা যাবে..
ভারতের প্রথম চন্দ্রাভিযান বরফের অস্তিত্বের কথা জানিয়েছিল। চন্দ্রযান ১-এর উৎক্ষেপণ ছিল সে দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বিমান বাবুর কথায়, আসল পরীক্ষা চন্দ্রযান ২-এর সামনে। মেরু বলতেই বরফ, এই ধারণা মহাকাশবিজ্ঞানীদের রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘বরফ মানেই জল। কাজেই চাঁদের মেরুতে জলের খোঁজ চন্দ্রযানের একটা বড় লক্ষ্য। পৃথিবীর আত্মজা চাঁদ। কাজেই পৃথিবীতে জলের উৎসের একটা সুলুক সন্ধান মেলাও আশ্চর্যের নয়।’’ জ্যোতির্বিদ বললেন, চাঁদে বরফ কোথায় রয়েছে, কী পরিমাণে রয়েছে, এই তথ্য যদি রোভার বার করতে পারে তাহলে আগামী দিনে চাঁদে স্টেশন বানানোর স্বপ্নটা মহাকাশবিজ্ঞানীদের ধরাছোঁয়ার মধ্যে এসে যাবে।
চাঁদে বায়ুমণ্ডল নেই, তাই টেলিস্কোপ বসানো যেতে পারে
‘‘প্রথম কথা বলতে পারি, চাঁদে বায়ুমণ্ডল নেই, চৌম্বকক্ষেত্র নেই, কাজেই চাঁদে যদি টেলিস্কোপ বসানো যায় তাহলে মহাকাশ গবেষণার অনেক কঠিন বিষয় সহজ হয়ে যাবে,’’ বিমান বাবু জানালেন, চাঁদ নিয়ে গবেষণা অনেক দেশই করছে। তবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর রহস্য উন্মোচনে খুব দেশই সফল হয়েছে। মহাকাশ প্রযুক্তির উন্নতিতে শুধুমাত্র কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠালেই হয় না, চরম কঠিন একটা চ্যালেঞ্জ নিতে হয়, যেটা করতে চলেছে ইসরো। তাঁর কথায়, চাঁদে পাকাপাকি ভাবে থাকার কথা যে বিজ্ঞানীরা খুব একটা ভাবছেন, সেটা নয়। চাঁদে মানুষ পাঠানোও খুবই ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। তবে ইসরোর লক্ষ আগামী দিনে চাঁদে সাময়িক ভাবে বসবাস করে গবেষণা চালানোর। তার জন্য চন্দ্রপৃষ্ঠের বা লুনার সারফেস যদি রেডিও টেলিস্কোপ বসানো যায়, তাহলে চাঁদের পিঠে সরাসরি আছড়ে পড়া মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। এই গবেষণা পৃথিবীর মাটিতে বসে করা খুবই কষ্টসাধ্য।
রেডিও অ্যাস্ট্রোনমির নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অভিযান
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে ঘিরে আছে আয়নোস্ফিয়ার। যেখানে চৌম্বক তরঙ্গ প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসছে। বিমান বাবু বললেন, কী কারণে মহাকাশ থেকে ধেয়ে আসা বেতার তরঙ্গ (খুব কম ফ্রিকুয়েন্সির)(Low Frequency) এই আয়নমণ্ডল প্রতিফলিত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, এটা আমরা পৃথিবীতে বসে দেখতে পাই না। এই বেতার তরঙ্গ নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে সহজ প্রক্রিয়া হলো পৃথিবীতে রেডিও টেলিস্কোপ বসানো বা চাঁদে চলে যাওয়া। এখন চাঁদে গিয়ে যদি রেডিও টেলিস্কোপ বসানো যায়, তাহলে রেডিও অ্যাস্ট্রোনমির দিশাই বদলে যাবে। ‘লো ফ্রিকুয়েন্সি’র তরঙ্গ নিয়ে যে গবেষণাগুলো পৃথিবীর মাটিতে বসে করা দুঃসাধ্য সেই রাস্তাটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। বিমান বাবু বললেন, ‘‘সবটাই আমার ধারণা, যে চাঁদে বসে রেডিও অ্যাস্ট্রোনমির চর্চা আগামী দিনে ভারতের একটা বড় মাইলস্টোন। যদিও এই প্রক্রিয়া এখনও আলোচনার স্তরেই রয়েছে, তবে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অভিযান দিয়েই এর সূচনা হতে পারে।’’