দিনভর ধরে এই নাটকীয় ঘটনা দেখার পর সাধারণ মানুষের মনে এখন মূলত দু'টি প্রশ্ন রয়েছে—
১) মুখ্যমন্ত্রীর হাতে ধরা ওই সবুজ ফাইল বা ফোল্ডারে আসলে কী ছিল?
এবং ২) ইডির তদন্ত চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী কি এভাবে ঢুকে পড়ে ফাইল নিয়ে আসতে পারেন?
.jpeg.webp)
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)
শেষ আপডেট: 8 January 2026 21:54
বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বড় ঘটনা (I Pac ED Raid) ছিল আইপ্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের (I Pac Prateek Jain) বাড়িতে ইডি-র (ED) অভিযান। সেই অভিযান চলাকালীন প্রতীকের ফ্ল্যাটে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তার পর বুকে আগলে একটি সবুজ ফোল্ডার (Green Folder) নিয়ে বেরিয়ে আসেন। পরে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের অফিসেও পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেও তাঁর এক সহযোগীকে দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে কিছু ফাইল রাখতে।
দিনভর ধরে এই নাটকীয় ঘটনা দেখার পর সাধারণ মানুষের মনে এখন মূলত দু'টি প্রশ্ন রয়েছে—
১) মুখ্যমন্ত্রীর হাতে ধরা ওই সবুজ ফাইল বা ফোল্ডারে আসলে কী ছিল?
এবং ২) ইডির তদন্ত চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী কি এভাবে ঢুকে পড়ে ফাইল নিয়ে আসতে পারেন?
ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়, এবারও মৌলিক প্রশ্নটি উঠছে ঠিকই, মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও তৃণমূল বিরোধীরা আগের মতই সমালোচনা করছেন, তবে এই তর্ক পূর্বের মতই এ যাত্রাতেও কোথাও পৌঁছে দেবে না।
এখন পড়ে রইল প্রথম প্রশ্ন—সবুজ ফাইলে কী ছিল?
শাসক দলের মুখ্য ভোটকুশলী তথা চিফ ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্টের বাড়িতে যখন ইডি তল্লাশি চালাচ্ছে, তখন তারা এ নিয়ে তাদের মতো করে কিছু তো প্রতিক্রিয়া দেবেই। রাজনৈতিক সংবাদদাতা হিসাবে আড়াই দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো বলতেন— ভোট এলেই ইডি সিবিআই জেগে ওঠে। এটা হল প্রতিহিংসার রাজনীতি। ভোটের লড়াইয়ে জিততে না পেরে বিজেপি এভাবেই ইডি সিবিআইকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করতে চায়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই কথাগুলো খুব ক্লিশে। অনেকেই এই গতে বাঁধা কথা শুনে পরের ভিডিওতে চলে যাবেন। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে রকম ক্লিশে কথা বলেননি। বরং বলেছেন, প্রতীকের বাড়িতে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা ছিল। বিজেপির লক্ষ্য ছিল ইডিকে লাগিয়ে সেটা চুরি করা। তৃণমূলের কৌশল চুরি করে জেনে নেওয়া।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বোঝাতে চেয়েছেন, ইডির অভিযান চলাকালীন প্রতীকের বাড়ি থেকে সেগুলো তিনি বের করে এনেছেন। মুখ্যমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, ওই সবুজ ফাইলের মধ্যেই তৃণমূলের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর ওই একটি কথাই টুং করে অনেকের কানে বেজেছে এবং সবুজ ফাইল বুকে তাঁর ছবিটাই এদিনের সেরা ফ্রেম হয়ে গেছে। এ ঘটনার পর তৃণমূলের ভাল হোক খারাপ হোক সেটা পরের কথা। এ টুকু বলতে পারি, ওই স্বল্প সময়ের মধ্যে এভাবে একটা ন্যারেটিভ সেট করে দেওয়ার ক্ষমতা বর্তমান রাজনীতিতে খুব কম লোকের রয়েছে।
হতেই পারে ওই সবুজ ফাইলের মধ্যে স্রেফ কয়েকটা সাদা কাগজ ছিল। কারণ, আমি আপনি কেউই তো দেখিনি। হয়তো ইডির অফিসারদের থেকে চেয়েই একটা সবুজ ফাইলে সাদা কাগজ ভরে তিনি বেরিয়েছেন। কিন্তু বাইরের কেউ তা জানতে পারবেন না। তৃণমূলের কোর ভোটার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একান্ত অনুরাগী ও অনুগামী, দলের তস্য নিচুতলার কর্মী—যাঁর মধ্যে এখনও আবেগটা বেঁচে আছে—তাঁর বা তাঁদের কাছেই এটাই বিশ্বাসযোগ্য হবে যে ওই ফাইলে প্রার্থী তালিকাই ছিল। রাজ্য ও জাতীয়স্তরে অনেক বিজেপি বিরোধীর কাছেও সেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে বলেই মনে করি। অন্তত সেই চেষ্টাটা চকিতে করে দেখালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আর সেটা হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। উনিশের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের বিপর্যয়ের ঠিক পরপরই আইপ্যাক বাংলায় আসে। প্রশান্ত কিশোর তৃণমূলের জন্য কাজ শুরু করেন। তৃণমূলের মূল সাংগঠনিক কাঠামোর এখন প্রায় শিরদাঁড়া হয়ে গেছে আইপ্যাক। রাজ্যের ৮১ হাজার বুথে তৃণমূলের ১০ জন করে বুথ কর্মীর নাম ধাম ঠিকানা ফোন নম্বর ইত্যাদি ডেটা পেশাদার ভাবে তাঁদের কাছে থাকা স্বাভাবিক। তৃণমূলের সমস্ত অঞ্চল সভাপতি, পঞ্চায়েত সদস্য থেকে শুরু করে সাংসদদের এক্স হ্যান্ডেলের পাসওয়ার্ড পর্যন্ত তাঁদের কাছে থাকা অস্বাভাবিক নয়।
তা ছাড়া বিধানসভা ভোটের আগে আসন ধরে ধরে প্রার্থী তালিকা তৈরির জন্য সমীক্ষার কাজ আইপ্যাকই করেছে। এই প্রক্রিয়া বিজেপি যেমন শুরু করেছে, তেমনই তৃণমূল শুরু করেছে। সেই সব সম্ভাব্য নাম ধামের ডিটেল আইপ্যাকের অফিসে বা প্রতীকের বাড়িতে থাকবে সেটাই দস্তুর। ভোটের আগে ধাপে ধাপে তৃণমূল কীভাবে প্রচার গড়ে তুলবে তার নকশাও আইপ্যাকের দফতরে বা প্রতীকের বাড়িতে থাকাটা সঙ্গত। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে সবুজ ফাইল বুকে আগলে প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন তা বিশ্বাস না করার যুক্তিও অনেকে পাবেন না।
এখন প্রশ্ন হল, প্রতীকের বাড়ি ও আইপ্যাকের দফতরে ইডি হানার রাজনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে?
সন্দেহ নেই এই ঘটনায় তৃণমূল বিরোধীরা প্রায় সবাই খুশি হবেন। তাঁদের অনেকেরই মনে হবে বেশ হয়েছে। তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে যে অংশ আই প্যাকের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ তাঁদেরও অনেকে খুশি হবেন। কারণ, আইপ্যাক দুর্বল হলে তাঁদের প্রাসঙ্গিকতা বাড়তে পারে। কিন্তু এর বাইরে আলাদা করে কোনও প্রভাব পড়বে বলে আমার মনে হয় না। বরং যাঁরা তৃণমূল বিরোধী কিংবা যাঁরা তৃণমূলের পক্ষে রয়েছেন—এই ঘটনা সেটাকে আরেকটু ধারালো করে দেবে মাত্র।
ভোটে এর প্রভাব কী পড়বে তা নিয়েও এখনই কিছু বলা মুশকিল। এ ব্যাপারে কেউ কেউ অতীত হাতড়াতে পারেন। তাঁদের মনে হতে পারে, ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের আগে রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই তল্লাশি হয়েছিল। সেই অস্থিরতার পর উনিশের ভোটে অভূতপূর্ব ভাল ফল করেছিল বিজেপি। বাংলায় ২টি আসন থেকে বাড়িয়ে লোকসভায় ১৮টি আসনে পৌঁছে গেছিলেন দিলীপ ঘোষরা। ঘটনা হল, ১৮ কিন্তু ৪২টি আসনের অর্ধেক নয়। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় বিজেপি ১০০ পার করবে, কিন্তু ম্যাজিক নাম্বারে পৌঁছতে পারবে না। তাও তো বিজেপির জন্য অভূতপূর্ব ফল।
আরও একটা প্রশ্ন হল— ইডি-র তদন্ত চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রীর ঢুকে পড়ার ঘটনাকে সামনে রেখে বাংলায় কি সংবিধানের ৩৫৫ ধারা বা ৩৫৬ ধারার প্রয়োগ হতে পারে?
আমার মনে হয় না। এটা ঠিক, এই ঘটনাকে কনস্টিটিউশনাল ব্রেক ডাউন বা সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার নিদর্শন হিসাবে প্রচার করবে বিজেপি। সেটা অমিত মালব্যরা শুরুও করে দিয়েছেন। তার মানে কিন্তু এই নয়, যে কেন্দ্র সেই ঝুঁকি নেবে। শেষ বার মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল, অরুণাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করে দিয়েছিল। তাই বিজেপি হয়তো সেই পথে গিয়ে নিজের হাত পুড়িয়ে তৃণমূলকে সুবিধা করে দিতে চাইবে না। তবে প্রচার করতে তাঁরা ছাড়বেন না।
তবে এ ঘটনা এখানেই থামবে বলে মনে হয় না। অতীতে যেভাবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজীব কুমারকে সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদের সামনে হাজিরা দিতে হয়েছিল, প্রতীক জৈনের কপালেও তা নাচতে পারে। অন্তত ইডি তাঁকে নোটিস দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকবে বলে সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে।
তা গোটা ঘটনায় বিজেপির অনেকে বেশ মজা পাচ্ছেন। তাঁদের মতে, তৃণমূলের সাংগঠনিক বিষয়-আশয় থেকে শুরু করে ভোট কৌশল ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সবটাই দেখে আই প্যাক। সেই সংস্থা তার কর্ণধারের বিরুদ্ধে ইডি তদন্ত হলে অস্থিরতা তো তৈরি হবে বটেই। তার পর স্বাভাবিক কাজ করা সহজ নয়।