ইডি হানা (Ipac ED Raid), মুখ্যমন্ত্রীর (Mamata Banerjee) ছুটে যাওয়া— ফের লাউডন স্ট্রিটে রাজনৈতিক নাটক। ২০১৯ থেকে ২০২৬— এক রাস্তার দুই তল্লাশি।
.jpeg.webp)
লাউডন স্ট্রিট যেন রাজনীতির 'হট পয়েন্ট'!
শেষ আপডেট: 8 January 2026 14:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শহর কলকাতার হিসেব-নিকেশে লাউডন স্ট্রিট (Loudon Street) একটি অভিজাত ঠিকানা। বরাবরই। সরকারি ও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের বাস সেখানে। রাস্তাটি বেশি চওড়া নয়। দু’ধারে সার বাঁধা বড় বড় বাড়ির গ্যারেজে পার্ক করা থাকে দামী দামী গাড়ি। কিন্তু রাজনীতির লেন্সে দেখলে— এই সরু রাস্তা যেন বারবারই চর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। দু’বার কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (Ipac ED Raid), দু’বারই বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর (Mamata Banerjee) আকস্মিক ছুটে যাওয়া এবং সেই দু’বারই লাউডন স্ট্রিটেই নির্মিত হয়েছে রাজনীতির নতুন বিতর্ক।
ফ্ল্যাশব্যাকে ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ২ নম্বর লাউডন স্ট্রিট। তৎকালীন সিপি রাজীব কুমারের বাড়ি। কেন্দ্রীয় তদন্ত।
আজ, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬-এর বৃহস্পতিবার। ৭ নম্বর লাউডন স্ট্রিট। সেই ফ্রেম আবার ফিরে এল। মাঝে কেবল পাঁচটি বাড়ির ফারাক।
সকাল থেকেই আইপ্যাকের দফতর ও সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের (Prateek Jain) লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে তল্লাশি চালাচ্ছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। বেলা গড়াতেই খবর ছড়িয়ে পড়ল। দুপুর ঠিক ১২টা নাগাদ দেখা গেল জিপসি গাড়ির সারি, সিআরপিএফের জওয়ান, ইডির সাদা জ্যাকেট— এসব ভিড় ভেদ করেই ঢুকে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তেমন কোনও নিরাপত্তা বলয় ছাড়াই।
তার ঠিক মিনিট পাঁচেক আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা। কেন্দ্র বনাম রাজ্য— সেই অদৃশ্য টাগ-অফ-ওয়ার দৃশ্যমান হয়ে উঠল একটা গেটের সামনে।
মিনিট দশেক বাদেই জৈনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন মুখ্যমন্ত্রী। হাতে একটি সবুজ ফাইল নিয়ে। ছিল একটি ল্যাপটপ আর একটি মোবাইলও। সেগুলি হাতে করে আগলে নিয়ে বাইরে এসে সরাসরি আক্রমণ, “আমার দলের প্রার্থীতালিকা থেকে একাধিক নির্বাচনী নথি বাজেয়াপ্ত করছে! অমিত শাহ দেশ চালাতে পারেন না, আমার দলের নথি দখল করতে চাইছেন!”
সাংবাদিকদের মাউথপিসগুলির সামনে যখন এই অভিযোগের সুর কড়া থেকে কড়াতর হচ্ছে, লাউডন স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে উড়ে আসছে অবধারিত প্রশ্ন, ‘ফাইলে কী আছে’, তখনই অনেকের মনে পড়ে যাচ্ছে সাত বছর আগের এক সন্ধের কথা।
এই দৃশ্যই আগে দেখা বাংলার— একবারে হুবহু।
২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। সন্ধেবেলা এই একই লাউডন স্ট্রিটের ২ নম্বর বাড়িতে, তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাংলোয় সিবিআই অভিযান চালিয়েছিল। সারদা কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়েছিল তাঁর। সেইদিনও হানা, সেইদিনও কেন্দ্রীয় সংস্থা, সেইদিনও মমতার পৌঁছে যাওয়া। আর সেই রাত থেকেই শুরু হয়েছিল ধর্মতলার সেই ধর্না। ৫ তারিখ ধর্না তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।
দুই ঘটনা, দুই বছর, দুই প্রেক্ষাপট। কাল আলাদা হলেও, স্থান একই। আর পাত্র অর্থাৎ উপস্থিত কিছু চরিত্রের ভূমিকাও অদ্ভুতভাবে মিল রেখে সাজানো।
রাজনীতি মহলের অনেকেই বলছেন, শুধু কাকতালীয় ঘটনা বলে উড়িয়ে দিলে হবে না, এ তো রীতিমতো ‘লাউডন স্ট্রিট পলিটিক্স!’ বিরোধীরা আবারও দাবি করছেন, সেই আগেরবারের মতোই, যে এবারও অসাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রের কাজে হস্তক্ষেপের। অভ্যন্তরীণ তৃণমূল শিবির বলছে, এটা রাজনৈতিক হয়রানি। আর কেন্দ্রের দাবি— স্রেফ তদন্ত ছাড়া কিছু নয়।
সবই যেন এক। মাঝখানে কেবল একটা প্রশ্ন— লাউডন স্ট্রিট কি শুধুই ঠিকানা, নাকি রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র? কারণ এমন স্ক্রিপ্ট বারবার ফেরে না, যদি না স্থানটা নিজের চরিত্র তৈরি করে ফেলে।
রাজনীতি এমনই। মাঝে মাঝে রোড, মোড়, বাড়ি— সবই হয়ে যায় ন্যারেটিভের অংশ। ভবিষ্যৎ বলবে, আজকের অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের ঘটনা আরও এবার লাউডন স্ট্রিটকে এক রাজনৈতিক প্রতীকের স্মারক বানিয়ে দিল কিনা।
তাই এ শহরের হাজারো রাস্তার ভিড়ে লাউডন স্ট্রিটের কিসসা যেন আলাদা। এ রাস্তা বারবার ঘটনাকে ডাক দেয়, নাকি ঘটনাপ্রবাহ রাস্তার টোপে এখানে এসে গোঁত্তা খায়? প্রশ্ন ঘোরে রাজনীতির আকাশে।