অভিযোগ করতেই ভয় পাচ্ছেন অনেকে। রীতিমতো মাফিয়া-রাজ কায়েম করা হয়েছে। ভয় ভেঙে কেউ যদি পুলিশে যায়ও অভিযোগ করতে, এ-রাজ্যের পুলিশ সেই অভিযোগ নেবে নাকি?

অংশুমান কর ও সুবোধ সরকার
শেষ আপডেট: 31 May 2025 19:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কবিতা আকাদেমিতে আর্থিক দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের জেরে কবিতা উৎসবই বন্ধ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রীকে যে চিঠি লিখেছেন বিশিষ্টজনেরা, তা ভিত্তিহীন ও হাস্যকর বলে দাবি করেছেন আকাদেমির সভাপতি, কবি সুবোধ সরকার। তবে অভিযোগের পাল্টা যে সব উত্তর তিনি দিয়েছেন, তা একেবারেই ‘সন্তোষজনক’ নয় বলে জানালেন অংশুমান কর। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকও রয়েছেন অভিযোগকারীদের তালিকায়। তাঁর দাবি, কবিতা আকাদেমির সমস্ত কাজকর্ম নিয়েই তদন্ত হোক নিরপেক্ষভাবে।
এদিন আকাদেমির সভাপতি সুবোধ সরকার ‘দ্য ওয়াল’কে জানান, কবিতা উৎসবে স্বজনপোষণের এবং সংখ্যালঘুদের ডাকা হয় না বলে যে অভিযোগটি তোলা হয়েছে, তা অসত্য। তাঁর কথায়, ‘গত আট বছরের ছাপানো নামের তালিকা দেখুন তা হলেই বুঝতে পারবেন আমরা কীভাবে সারা বাংলা থেকে প্রান্তিক অঞ্চল থেকে প্রতিভাবান সংখ্যালঘুদের আমন্ত্রণ করে ডেকে আনি নন্দন চত্বরে। ... সাতশো-আটশোজন কবি, আবৃত্তিকার, কথাসমন্বয়কারী, অধ্যাপক, আলোচক, শিল্পী ডাক পেয়ে আসছেন বছর বছর।’
এই প্রসঙ্গে অংশুমান করের বক্তব্য, ‘২০২৪ সালের উৎসবের তালিকা থেকে দেখতে পাচ্ছি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কবি/আবৃত্তিকারদের ডাকা হয়েছে মাত্র ১৮ জনকে। এর মধ্যে মাত্র একজন আবৃত্তিকার। বাকিরা কবি। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৭০০ ধরলে শতাংশের হিসেবে মাত্র ২.৫ শতাংশ। অথচ এ রাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩৩ শতাংশ এবং তাঁদের অনেকেই কবিতা লেখেন। তাঁদের কখনওই এই উৎসবে ডাকা হয় না। এরপরও কি বলা অন্যায় যে, এই উৎসবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বঞ্চিত?’
অংশুমান করের আরও বক্তব্য, ‘প্রশ্ন উঠেছে যে, গত এক বছরে আকাদেমির পরিচালন কমিটির মাত্র একটি সভা হয়েছে কেন? এর কোনও উত্তর উনি দেননি। বলেছেন, কবিতা লেখার কর্মশালা এবং আবৃত্তির কর্মশালা হয়েছে। আমি জানতে চাই যে, গত ১০ বছরে এরকম ক’টি কর্মশালা হয়েছে? দায়িত্ব নিয়ে বলছি, সংখ্যাটা ১০-ও পেরোবে না। গড় হিসেবে বছরে একটিও নয়। গত বছর এই ধরনের কোন কর্মশালা হয়েছে কি? প্রশ্ন উঠেছে যে, বাংলা কবিতার কোনও হিন্দি বা ইংরেজি অনুবাদের কাজ এই আকাদেমি করেছে কি? কোনও সংকলন গ্রন্থ প্রকাশ করেছে কি? বাংলা কবিতার কোনও আর্কাইভ নির্মাণের চেষ্টা করেছে কি? কোনও পত্রিকা প্রকাশ করেছে কি? এইসব প্রশ্নের উত্তরই সভাপতি দেননি।’
এখানেই শেষ নয়। সুবোধ সরকার এদিন আকাদেমির সপক্ষে বলেন, এই নিয়ে মূল অভিযোগকারী নিজেই একজন ‘ক্যাডার’ এবং তাঁর বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ রয়েছে।
এই বক্তব্যকে ‘ব্যক্তিগত আক্রমণ’ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উনি বলেছেন মূল প্রতিবাদী নাকি একজন ক্যাডার শিক্ষক যাঁর ব্যক্তি জীবনের প্রতি উনি কুৎসিত ইঙ্গিত করেছেন। যে-ঘটনাটির কথা বলেছেন, মহামান্য কলকাতা আদালত সেই তথাকথিত ক্যাডার শিক্ষককে এই ঘটনাটির জন্য ক্লিনচিট দিয়েছেন। তারপরও এই কথা বলা আদালত অবমাননার সমতুল। প্রশ্ন করলেই ব্যক্তি জীবন নিয়ে কুৎসা করা আসলে ওঁদের অভ্যাস। সভাপতির বা তাঁর স্তাবকবৃন্দের ব্যক্তি জীবন নিয়ে প্রশ্ন করলে ওঁরা তার উত্তর দিতে পারবেন তো?’
এদিন সুবোধ সরকার এ-ও বলেন, আর্থিক দুর্নীতি এবং টাকা তোলার যে অভিযোগ, তা নিয়ে প্রমাণ-সহ পুলিশে এফআইআর করা হচ্ছে না কেন? অংশুমান করের বক্তব্য, ‘বাংলা কবিতার জগতে ভয়ের এমন একটা বাতাবরণ তৈরি করে রাখা হয়েছে যে, অভিযোগ করতেই ভয় পাচ্ছেন অনেকে। রীতিমতো মাফিয়া-রাজ কায়েম করা হয়েছে। ভয় ভেঙে কেউ যদি পুলিশে যায়ও অভিযোগ করতে, এ-রাজ্যের পুলিশ সেই অভিযোগ নেবে নাকি? আমাদের অভিজ্ঞতা তো অন্য কথা বলে। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই পুলিশ এই ধরনের অভিযোগ নিতে পারে। আমরা তাই মুখ্যমন্ত্রীর কাছেই তদন্তের দাবি রেখেছি।’
সব শেষে অংশুমান করের কথায়, ‘নিরপেক্ষ তদন্ত হোক না। তাহলেই তো সত্য সামনে আসবে। এক্ষেত্রে আমি মুখ্যমন্ত্রীর ওপর ভরসা রাখছি কারণ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতেই তো সরকার এই অর্থবর্ষে উৎসব বন্ধ করে দিয়েছে। এটা তো সরকারের তরফে একটা সদর্থক পদক্ষেপ।’