দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিড ঝড় সামলে সবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে চিন। স্বাভাবিক হয়েছে জীবনযাপন। এর মধ্যেই প্রকোপ দেখা দিয়েছে আরও একটি মারাত্মক সংক্রামক ব্যাকটেরিয়া-ঘটিত রোগের। জানা গিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম চিনে ব্রুসেলা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে ব্রুসেলোসিস রোগে আক্রান্ত অন্তত ৬ হাজার জন। প্রত্যেকেরই নমুনা পরীক্ষায় ব্রুসেলোসিস পজিটিভ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে চিনের সংবাদ সূত্র।
জানা গেছে, গানসু প্রদেশের ল্যানঝাউ শহরের একটি বায়োফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থার ল্যাবে ব্রুসেলোসিসের প্রতিষেধক বা ব্রুসেলা ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছিল গত বছর জুলাই-অগস্ট মাসে। তখনই কোনও ভাবে সেই ব্যাকটেরিয়াল স্ট্রেন ছড়িয়ে পড়ে ল্যাবে। আক্রান্ত হন বহু মানুষ। তবে এর পরে সেই ল্যাব সঠিকভাবে স্যানিটাইজ করা হয়েছিল কিনা বা ফের ওই ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ হয়েছিল কিনা সেটা জানা যায়নি।
ব্রুসেলোসিস সংক্রমণ সাধারণত পশুদের থেকে ছড়ায়। কাঁচা বা ভাল ভাবে রান্না না করা পশুর মাংস খেলে অথবা মৃত পশু বা তার দেহাবশেষের সংস্পর্শে এলে এই ধরনের রোগ ছড়ায়। বিশুদ্ধ না করা ডেয়ারি প্রোডাক্ট থেকেও ব্রুসেলোসিস ছড়াতে দেখা গেছে।

এই রোগের অন্যতম প্রধান উপসর্গ হল, জ্বর, দুর্বলতা, গায়ে এবং মাথায় ব্যথা। শরীরে স্থায়ী আর্থ্রাইটিস হতে পারে এবং বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুলেও উঠতে পারে। এই অসুখ পুরুষ ও নারীর যৌনাঙ্গেও ক্ষতি করে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে এই রোগে মৃত্যুও হতে পারে বলে জানিয়েছে সিডিসি।
এখনও চিনে কেউ মারা যাননি এই সংক্রমণে। ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধকারী সেন্টারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সঠিক সময়ে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে এই রোগ সেরে যাওয়া সম্ভব। কোভিড ১৯-এর কোনও চিকিত্সা না-থাকলেও ব্রুসেলোসিসের চিকিত্সায় একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে। তবে কোভিডের মতো এরও কোনও ভ্যাকসিন নেই। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক খেলেও ব্রুসেলোসিস থেকে সেরে উঠতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। তার পরেও ফের সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু জানিয়েছে, এক মানুষের থেকে অন্য মানুষের দেহে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া প্রায় বিরল ব্যাপার। ফলে ধরেই নেওয়া যায়, চিনে যত জন মানুষ ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত, তাঁরা সকলেই ল্যানঝাউয়ের ওই ল্যাব থেকে ছড়িয়ে পড়া ব্যাকটেরিয়ার শিকার। এর পরেই গত মাসে চিনের প্রশাসনের তরফে আইন করা হয়েছে, বায়োসিকিফরিটির ঝুঁকি কমানো এবং নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও অভিযোগ উঠেছিল, উহানেরই একটি ল্যাব থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। যদিও তার প্রমাণ এখনও মেলেনি।
ল্যানঝাউয়ে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা প্রথম সামনে আসে গত বছর নভেম্বর মাসে। ল্যানঝাউ ভেটেরিনারি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কয়েক জন পড়ুয়ার শরীরে ব্রুসেলোসিস ধরা পড়ে। ডিসেম্বর মাসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮১। এর রেই চিনের হেইলংজিয়াং প্রদেশ থেকে খবর মেলে ওই ইনস্টিটিউটের ১৩ জন কর্মচারীর রক্তে ব্রুসেলা জীবাণুর অস্তিত্ব মিলেছে।

এর পরেই গণহারে পরীক্ষা করতে শুরু করে সরকার। চিনের সংবাদ মাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ৫৫ হাজার ৭২৫ জনের টেস্টিংয়ে ৬৬২০ জন পজিটিভ এ পর্যন্ত। ওই সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, চায়না অ্যানিম্যাল হাজব্যান্ড্রি ইন্ডাস্ট্রির একটি বায়োফার্মাসিউটিক্যাল ফ্যাক্টরি থেকে এই সংক্রমণ ছড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন ল্যানঝাউ হেল্থ কমিশন। তাদের দাবি, ফ্যাক্টরির বর্জ্য গ্যাসে মিশে ছিল ব্রুসেলা, সেটাই গিয়ে পৌঁছয় ল্যানঝাউ ভেটেরিনারি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে।
তবে এই প্রথম নয়। চিনে প্রথম এই সংক্রামক ব্যাকটেরিয়া-ঘটিত রোগটির অস্তিত্ব মিলেছিল ১৯০৫ সালে। এছাড়াও ১৯৫০ এবং ১৯৬০ সালে চিনে ব্রুসেলোসিস মহামারিও হয়েছিল। উত্তর এবং পশ্চিম চিনে এই অসুখ এখনও খুব বেশি দেখা যায় গবাদি পশুর শরীরে। মানুষের শরীরেও এই রোগের প্রকোপ দেখা গেছে। তবে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে ছড়ানোর প্রমাণ মেলেনি। গত বছরেও চিনে যে অসংখ্য সংক্রামক রোগ হয়েছিল বড় আকারে, তাতে আন্ত্রিক ও ডেঙ্গির সঙ্গেই ছিল ব্রুসেলোসিস অসুখের নামও।