SIR থেকে CAA, যুবভারতী থেকে মহাকুম্ভ—বিভাজনের রাজনীতিতে বিজেপিকে একযোগে তোপ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 16 December 2025 23:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেসির কলকাতা সফরে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে (Yuva Bharati Incident) ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলা নিয়ে এবার মুখ খুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। তাঁর প্রশ্ন, ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার পরেও কেন রাজ্যকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে? এছাড়াও মঙ্গলবার দিল্লিতে (সংসদের বাইরে) সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে MGNREGA, CAA, ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) -এর মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে কড়া আক্রমণ শানালেন।
MGNREGA প্রকল্পের বকেয়া টাকা নিয়ে তৃণমূলের লড়াই প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, "MGNREGA নিয়ে আমরা যে লড়াই চালিয়েছি, তা সবার জানা। হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে এসএলপি (SLP) দাখিল করেছিল, যা খারিজ হয়ে যায়। আমরা মানুষের জন্য সংসদে এই আওয়াজ তোলা জারি রাখব।"
ভোটার তালিকা সংশোধনের খসড়া তালিকা প্রকাশের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের (ECI) চরম সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে SIR-এর সামগ্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। এই অপরিকল্পিত কাজের জন্য অনেক বিএলও (BLO) মারা গেছেন। এই কাজ দুই বছরে করা যেত, আপনারা করছেন দুই মাসে।"
অভিষেক জানান, প্রকাশিত খসড়া তালিকায় হুগলির ডানকুনি ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের একজন কাউন্সিলরকে 'মৃত' ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন, যদিও তিনি জীবিত আছেন।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) নিয়ে বিজেপিকে সমাজের বিভাজনে বিশ্বাসী বলে তোপ দাগেন। তিনি বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রশ্ন করেন, "বিজেপিকে জিজ্ঞেস করুন, আইন তৈরির নিয়মাবলী তৈরি করতে তাদের পাঁচ বছর লাগল কেন? ২০১৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কতজনকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই তালিকা তারা প্রকাশ করুক। বিজেপির কোনও জবাবদিহি নেই।"
বলেন, "আসামে যখন NRC হয়েছিল, কতজন বাদ পড়েছিলেন এবং বর্তমানে তাঁরা কোথায় আছেন? ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে, পরে আদালতের নির্দেশে তাঁদের ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে।"
ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) হোক বা FIR, তৃণমূলের ভোট শতাংশ ও আসন বাড়বে বলে তিনি বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করেন। বলেন, "যদি আমাদের ভোট শেয়ার বাড়ে, তবে বিজেপিকে তাদের আটকে রাখা ২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়তে হবে। পাশাপাশি বাংলার মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। বিজেপি কি আমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে? ভয় পাচ্ছে বিজেপি, তৃণমূল নয়।"
রাজ্যপালের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "রাজ্যপাল একটি মনোনীত পদ, তাঁকে উত্তর দেওয়ার জন্য আমি সংসদে নির্বাচিত হইনি।"
যুবভারতীর ঘটনায় রাজ্যের ভূমিকা তুলে ধরে অভিষেক বলেন, “যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যা হয়েছে, তার এক ঘণ্টার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। পুলিশকর্তা থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও কেন আমাদের বারবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে?”
এই ঘটনার পর রাজ্যের দ্রুত ও সদর্থক পদক্ষেপের প্রশংসা করেন তিনি। অভিষেকের কথায়, “খোদ মুখ্যমন্ত্রী মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এটাই তাঁর দায়বদ্ধতা এবং সামর্থ্যের প্রতীক। তিনি ঝুঁকতেও জানেন। একটা ঘটনা ঘটেছে, তার পর রাজ্যের তরফে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
একই সঙ্গে বিজেপিকে তীব্র কটাক্ষ করেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তাঁর প্রশ্ন, “কুম্ভ মেলায় যখন বহু মানুষের মৃত্যু হয়, তখন তো প্রধানমন্ত্রী বা যোগী আদিত্যনাথকে কেউ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় না। তদন্ত তো দূরের কথা, ন্যূনতম ক্ষমা পর্যন্ত কেউ চায় না। তখন যোগী আদিত্যনাথ বা সুকান্ত মজুমদারদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয় না কেন?”
প্রসঙ্গত, গত ১৩ ডিসেম্বর ‘গোট ট্যুরে’ কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী তারকা লিওনেল মেসি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ ও রড্রিগো ডি পল। কিন্তু হাজার হাজার টাকা খরচ করেও বহু দর্শক মেসিকে কাছ থেকে দেখতে পাননি বলে অভিযোগ ওঠে। মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারি থেকে বোতল ছোড়া হয়, ভাঙচুর করা হয় ব্যানার। পরে ব্যারিকেড ভেঙে মাঠে ঢুকে উন্মত্ত জনতা তাণ্ডব চালায়।
সেই সময় মেসির সঙ্গে যুবভারতীতে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। ঘটনার পর তিনি ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মেসি ও দর্শকদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীমকুমার রায়ের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটি দ্রুত কাজ শুরু করে।
প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে একাধিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্য। তদন্ত কমিটির সুপারিশ মেনে সিট গঠন করা হয়েছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারকে শোকজ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শোকজ করা হয়েছে বিধাননগরের কমিশনার মুকেশ কুমার, যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া দপ্তরের সচিব রাজেশ কুমার সিনহাকে। বিধাননগরের ডিসি অনীশ সরকারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সিইও দেবকুমার নন্দনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এই সমস্ত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করছেন, রাজ্য সরকার দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যা যা করা প্রয়োজন, সবই করেছে। তাঁর মতে, এর পর আর প্রশ্ন তোলার কোনও অবকাশ থাকে না।