এই কাহিনি কোনও অনলাইন স্ক্যাম নয়। কোনও অচেনা লিংক, ওটিপি বা ফেক অ্যাপের ফাঁদও নয়। এ কাহিনি সরলতার। একাকীত্বের। আর বিশ্বাসের ওপর নিখুঁত ছুরির আঘাতের।

গ্রাফিক্স-দ্য ওয়াল।
শেষ আপডেট: 16 December 2025 20:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চকচকে মার্সিডিজ (Mercedes)। বিদেশি ব্র্যান্ডের ঝকঝকে লোগো। রাস্তায় নামলেই চোখ ফেরানো দায়।
বহুদিনের স্বপ্ন ছিল, একদিন প্রিমিয়াম গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখবেন! কিন্তু সাধ্য? সে আর হিসেব কষেনি সুরজ রজক। কারণ তার স্বপ্নের রাস্তাটা সোজা ছিল না, ছিল বিশ্বাস ভাঙার গলি।
এই কাহিনি কোনও অনলাইন স্ক্যাম নয়। কোনও অচেনা লিংক, ওটিপি বা ফেক অ্যাপের ফাঁদও নয়। এ কাহিনি সরলতার। একাকীত্বের। আর বিশ্বাসের ওপর নিখুঁত ছুরির আঘাতের।
সল্টলেকের জি সি ব্লকের বৃদ্ধা। ছেলে-মেয়ে থাকেন বিদেশে। দিন কাটে একা। ব্যাঙ্কের কাজ, অনলাইন লেনদেন, সবই তাঁর কাছে ধোঁয়াশা। সেই দুর্বলতাই বুঝে গিয়েছিল সুরজ।
একদিন ব্যাঙ্কে যাওয়ার পথে রাস্তায় আলাপ। নিজেকে পরিচয় দেয় বেসরকারি ব্যাঙ্কের কর্মী হিসেবে। কথা মিষ্টি। বিনিয়োগের গল্প আরও মিষ্টি। বৃদ্ধা সরল মনে জানিয়ে দেন, অনলাইনের কাজকর্ম তাঁর মাথার ওপর দিয়ে যায়।
এই কথাটার অপেক্ষাতেই ছিল সুরজ। “একদিন বাড়িতে গিয়ে সব বুঝিয়ে দেব,” বলেই হাজির হয় বৃদ্ধার ঘরে। শুরু হয় লাভের অঙ্ক। নতুন অ্যাকাউন্টে টাকা রাখলে নাকি মুনাফা বাড়বে। কোথাও যেতে হবে না, সব ব্যবস্থাই সে করে দেবে।
তারপর একে একে চেয়ে নেয় কেওয়াইসি, চেক, ব্যাঙ্কের কাগজ। বৃদ্ধা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব তুলে দেন। অন্ধকারেই থাকেন তিনি।
এরপর নীরবে বদলে যায় ব্যাঙ্কে নথিভুক্ত মোবাইল নম্বর। ই-মেল আইডি। আরটিজিএস। জাল সইয়ের চেক। চুপিসারে উধাও হতে থাকে টাকা। ৯০ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা!
বিশ্বাসের টাকায় শুরু হয় বিলাস। মার্সিডিজ কেনে সুরজ। স্বপ্ন পূরণ হয় তার, অন্যের সঞ্চয়ের দামে।
কিন্তু নাটকের পর্দা ফাঁস হয় ছেলের দেশে ফেরায়। ব্যাঙ্কে গিয়ে ধাক্কা, মায়ের অ্যাকাউন্ট প্রায় ফাঁকা। মুহূর্তে ভেঙে পড়ে সব।
বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় অভিযোগ। তদন্তে নামে পুলিশ। ইলেকট্রনিক ট্রেল ধরে একে একে খুলে যায় রহস্য। শেষমেশ গ্রেফতার সুরজ রজক।
পুলিশের সামনে কোনও লুকোচুরি নয়। অকপট স্বীকারোক্তি, “স্যার, বহুদিনের স্বপ্ন ছিল প্রিমিয়াম গাড়ি কেনার। তাই টাকা হাতিয়েই কিনে ফেলেছি।”
উদ্ধার হয় মার্সিডিজ। বাজেয়াপ্ত করা হয় আরসি স্মার্টকার্ড। পুলিশ জানায়, ৯০ লক্ষের মধ্যে ৪৩ লক্ষ খরচ হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে ১০ লক্ষ গেছে গাড়িতে। বাকি ৪৭ লক্ষ এখনও অক্ষত, ফ্রিজ করা হয়েছে। টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু।
স্বপ্ন ছিল মার্সিডিজের। কিন্তু বিশ্বাস ভেঙে কেনা সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত আটকে গেল আইনি গ্যারেজে।