অবশেষে ২০১৭ সালে আদালতের নির্দেশে লিকুইডেশনে চলে যায় ডানলপ। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে ওঠে।

শেষ আপডেট: 17 September 2025 15:12
দ্য ওয়াল ব্য়ুরো, হুগলি: হুগলির সাহাগঞ্জ। এক সময় এই নাম উচ্চারিত হতো গর্বের সঙ্গে। কারণ এখানে দাঁড়িয়ে ছিল দেশের প্রথম টায়ার প্রস্তুতকারী কারখানা ডানলপ। সেই উজ্জ্বল ইতিহাস আজ অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। এক সময় এই কারখানার শ্রমিকরা বুক ফুলিয়ে বলতেন, তাঁরা ডানলপের শ্রমিক। বিশ্বকর্মা পুজো ছিল তাঁদের কাছে দুর্গাপুজোর থেকেও বড় আনন্দের উৎসব। কারখানার আঙিনা আলোয় ঝলমল করত, মঞ্চ বাঁধা হতো, মেলা বসত, হত নাটক-যাত্রা-থিয়েটার। চলত খাওয়াদাওয়া, উন্মাদনায় মেতে উঠত গোটা সাহাগঞ্জ।
সেই সব আজ অতীত। এখন ডানলপের বিশাল গেটে মরচে ধরা লোহার পাত আর আগাছায় ঢেকে যাওয়া কারখানা চত্বর। দেশের প্রথম এ্যারো টায়ার তৈরির কারখানা ছিল সাহাগঞ্জের ডানলপ। কিন্তু শ্রমিক অসন্তোষ, মালিকপক্ষের দ্বন্দ্ব, আর্থিক দুরবস্থার বোঝা ক্রমে সব আলো নিভিয়ে দেয়। ২০১১ সালে ‘সাসপেনশন অফ ওয়ার্ক’-এর নোটিস ঝোলে গেটে। থেমে যায় তিন শিফটের কাজ, মেশিনের শব্দ। শ্রমিকরা তাঁদের পিএফ, গ্র্যাচুইটি, বকেয়ার দাবিতে পথে নামেন। মামলা যায় হাইকোর্টে। অবশেষে ২০১৭ সালে আদালতের নির্দেশে লিকুইডেশনে চলে যায় ডানলপ। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে ওঠে।
যেসব পরিবার কোয়ার্টারে থাকতেন, তাঁদের আশা ছিল—একদিন হয়তো ফের শুরু হবে কারখানা। কিন্তু দিনকে দিন সেই বিশ্বাসও ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। এখন তাঁদের সন্তানরা জানে, যে কারখানায় একসময় প্রজন্মের পর প্রজন্ম চাকরি করে সংসার চলেছে, সেই কারখানা আর জীবিকা জোগাবে না। বর্তমান রাজ্য সরকার আইন এনে কারখানার অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিলেও বাস্তবায়ন হয়নি। হাতে গোনা কয়েকজন অবশিষ্ট শ্রমিক ভাতা পেলেও তা জীবিকা নির্বাহের পক্ষে যথেষ্ট নয়। আজও বহু প্রাক্তন শ্রমিক দিন আনে দিন খায়।
তাঁদেরই স্মৃতিতে এখনও ফিরে আসে বিশ্বকর্মা পুজোর অতীত গৌরব। তাঁরা জানান, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ডানলপ কারখানা হয়ে উঠত উৎসবমুখর। সেই দিন সাধারণ মানুষও প্রবেশাধিকার পেতেন ভিতরে। নিজেদের চোখে দেখতেন কেমন করে টায়ার তৈরি হয়। শ্রমিক পরিবারের শিশু থেকে শুরু করে আশপাশের মানুষ—সবার কাছে এই উৎসব ছিল অমলিন আনন্দের। আজ আর বিশ্বকর্মা পুজোয় আলোর ঝলকানি নেই, বাদ্য বাজে না, মেলা বসে না। কারখানার ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু চোখের কোণে জল নিয়ে প্রণাম করেন অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকরা।
কারখানার অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক নির্মল সিং,অসীম বসুরা বলেন, "বিশ্বকর্মা পুজো এলেই এখন মন খারাপ লাগে, আগে কত আনন্দ করতাম। যাত্রা, থিয়েটার খাওয়া-দাওয়া মেলা কত কিছুই হতো। এখন শুধুই শ্মশানের স্তব্ধতা।" তাও কারখানার গেটে গিয়ে প্রণাম করে এসেছেন তাঁরা। প্রার্থনা করেছেন, আবার খুলুক ডানলপের গেট, আবার বিশ্বকর্মা পুজোয় আলোর রোশনাইয়ে মাতুক সাহাগঞ্জ।