বহু প্রাচীন সর্বমঙ্গলা মন্দিরে অধিষ্ঠাতা দেবীকে অত্যন্ত জাগ্রত বলেই মানেন অবিভক্ত গোটা বর্ধমান জেলার বাসিন্দারা

শেষ আপডেট: 10 September 2025 17:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতার যেমন কালীঘাটের কালী (Kalighat Kali), বীরভূমে যেমন তারামা (Tara Ma), তেমনি দক্ষিণবঙ্গের শস্যগোলা বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা( Sarbamangala Temple Bardhaman)। শারদীয়ায় তিনিই দুর্গা হিসেবে পুজিত হন। এখানকার পুজোয় তাই জড়িয়ে আছে দক্ষিণবঙ্গের জীবনধারার নানা লোকাচার, বিশ্বাসের পরম্পরা। শাক্ত সাধনার ক্ষেত্রে দেবী সর্বমঙ্গলা একটু আলাদা ঘরানার।
বহু প্রাচীন সর্বমঙ্গলা মন্দিরে অধিষ্ঠাতা দেবীকে অত্যন্ত জাগ্রত বলেই মানেন অবিভক্ত গোটা বর্ধমান জেলার বাসিন্দারা। পুজোর কদিন তিনিই ঘরের মেয়ে উমা। দুর্গা। ইতিহাস বলে, রাজা তেজচন্দ্রের আমলে এই মন্দির নির্মাণ হয়েছিল। মন্দির ঘিরে অনেক উপকথা আছে। চুনুরি বাড়ির মেয়েরা নাকি দেবীর পাষাণ প্রতিমায় গুগলি থেতো করতেন। সেই মেছুনিরাই পরে মাতৃরূপ বুঝতে পেরে তার পুজো শুরু করেন। দেবীর ভোগে মাছের টক সেই থেকেই প্রচলিত। স্বপ্নাদেশ পেয়ে দেবীকে এই প্রাচীন মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাজ অনুজ্ঞায় পুরোহিতরাও নিযুক্ত হন।
মন্দিরের প্রধান পুরোহিত অরুণ ভট্টাচার্য জানান, দেবী দুর্গা এখানে সর্বমঙ্গলা রূপে পুজিতা হন। সারাবছরই তিনি বিরাজ করেন। পুজোর চারদিন ষোড়শোপচারে দেবীর আরাধনা হয় সর্বমঙ্গলা মন্দিরে। আগে মহিষ ও পাঁঠা বলি হত। এখন বলিপ্রথা বন্ধ হয়েছে। আগে সন্ধিপুজোর মহালগ্নে কামান দাগা হত। কিন্তু ১৯৯৭-এ ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর থেকে সেই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। নবমীতে কয়েক হাজার মানুষকে ভোগ বিলি করা হয়। পুজোর দিনগুলোতে প্রতিদিনই কয়েক হাজার ভক্তদের সমাগম হয়।
মন্দিরে থাকা সর্বমঙ্গলার মূর্তিটি মন্দিরের থেকেও বেশি প্রাচীন। অনেকের মতে ১০০০ বছর, আবার কারও মতে তা ২০০০ বছরের পুরনো। এই মূর্তিটি হল কষ্টিপাথরের অষ্টাদশভূজা সিংহবাহিনী মহিষামর্দিনী। দৈর্ঘ্যে বারো ইঞ্চি, প্রস্থে আট ইঞ্চি। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বলেন, "নবমীর দিন ন'জন কুমারীকে দেবী দুর্গার নয় রূপে পুজো করা হয়। নাবালিকাদের দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপে পুজো করাই এখানে নিয়ম । দেবী এখানে অষ্টাদশভুজা। বয়সের প্রকারভেদ অনুসারে উমা, মালিনী, কুজ্জ্বিকা, সুভাগা, কালসন্দর্ভা সহ দেবীর ন'টি রূপে এখানে কুমারী পুজো করার চল।"
মহালয়ার পরদিন সকালে ঘট উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের দুর্গাপুজো শুরু হয়। প্রথা মেনে প্রতিপদে সর্বমঙ্গলা মন্দিরে ঘটস্থাপন হতেই পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ে যায় বর্ধমানে। রীতি মেনে প্রতিপদের দিন বর্ধমানের রাজাদের খনন করা কৃষ্ণসায়র থেকে জল ভরা হয় ঘটে। সেই ঘট সর্বমঙ্গলা মায়ের মন্দিরে স্থাপন করা হয়। দেবীকে সেদিন পরানো হয় রাজবেশ। বর্ধমানের রাজারা জন্মসূত্রে ছিলেন পাঞ্জাবী। পরে বধূ হিসেবে নানা রাজ্যের মেয়েরা এসেছেন পরিবারে। নানা সংস্কৃতি, লোকাচারের মিশেল হয়েছে এখানে। সঙ্গে মিশেছে বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হবার পরে, বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজা উদয়চাঁদ ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। বোর্ডের হাতেই মন্দিরের পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে।বর্তমানে এই বোর্ডে প্রশাসনিক আধিকারিকরাও আছেন।।