
শেষ আপডেট: 3 May 2019 08:42
ঘূর্ণিঝড়টি ৮ই নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়। ক্রমশ তা শক্তি বাড়িয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়। ১১ই নভেম্বর বিকেলে, চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের মাত্র ৯৫ কিমি দূরে, ঘূর্ণিঝড় ভোলা তটভাগ ছোঁয়। তখন তার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার। রাত দশটায় চট্টগ্রামের আবহাওয়া অফিসের অ্যানিমোমিটার ( anemometer ) উড়ে যায় ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে। ভোলার গতিবেগ আর রেকর্ড করা যায়নি। তবে পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে, সমুদ্রে ভাসমান একটি জাহাজ রেকর্ড করে ভোলার গতিবেগ। সেই সময় ভোলার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২২ কিমি।
সুপার সাইক্লোন ভোলার সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটার। ভোলার দাপটে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপ সংলগ্ন অঞ্চলে হয়েছিল প্রবল জলোচ্ছাস। প্রাণ হারিয়েছিলেন ৫ লাখ মানুষ। অধিকাংশ মানুষই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের সমুদ্র সমতলের ভূমিতে জলোচ্ছ্বাসে ডুবে মারা যান। ক্ষতি হয়েছিল তখনকার মুল্যে ৮৭ মিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় বাংলাদেশের তাজুমুদ্দিন উপজেলা। সেই জেলায় বসবাসকারী ১,৬৭,০০০ মানুষের মধ্যে ৪৫ শতাংশ মানুষই প্রাণ হারিয়েছিলেন।
ভোলার দাপটে চট্টগ্রাম বন্দরে আছড়ে পড়েছিলে পনেরো ফুটের ঢেউ। বন্দরে ও সমুদ্রতটে ধাক্কা খেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল হাজার হাজার নৌকা, স্টিমার ও জাহাজ। চার ফুট জলের তলায় ডুবে গিয়েছিল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এয়ারপোর্ট। ভোলার প্রকোপে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হন প্রায় ৩৬ লক্ষ মানুষ।
ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার ৮৫% বাড়ি ভেঙে পড়েছিল। ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার নৌকা হারান ৭৭০০০ মৎসজীবীর মধ্যে ৪৬০০০ জন। চাষের ক্ষতি হয়, তখনকার মূল্যে ৬৩ মিলিয়ন ডলারের। ২৮০০০০ গবাদিপশু মারা যায়। ৭৫% মানুষকে ত্রাণের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয় মাসের পর মাস। পাকিস্তান রেডিও একটি বুলেটিনে জানিয়েছিল, চট্টগ্রামের কাছাকাছি ১৩ টি দ্বীপের একজন মানুষও বেঁচে ছিলেন না।
বাংলাদেশ তখন পূর্ব-পাকিস্তান। বাংলাদেশে তখন চলছে ইয়াহিয়া খানের রাজত্ব। তাঁর সরকার ত্রাণের ক্ষেত্রে গড়িমসি দেখানোয় বিপর্যয় আরও বাড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের পরও যারা বেঁচে ছিলেন, তাঁরা মারা যান, খাবার আর জলের অভাবে।স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, ইয়াহিয়া খান সরকারের তীব্র সমালোচনা করে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
ঘূর্ণিঝড়ের এক সপ্তাহ পর, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্বীকার করেন, তাঁর সরকার দুর্যোগের ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি।ত্রাণকার্য সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের মানুষগুলোর প্রতি পাকিস্তান সরকারের এই নির্মম আচরণের জন্য বাংলাদেশে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক নির্বাচনে বিপুল ভাবে জয়লাভ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়, একটি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৯১ সালেও একই এলাকায় BOB- 1 নামে আরেকটি ভয়াবহ সুপার সাইক্লোন এসেছিল। যেটির গতিবেগ ছিল ভোলার থেকেও বেশি। ঘন্টায় ২৬০ কিমি। কিন্তু সেবার আগে থেকে বাংলাদেশ সরকার ব্যবস্থা নেওয়ায় কিছু ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও, প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৪০০০০ মানুষ। ১ কোটি মানুষ তাদের সর্বস্ব হারান। সুপার সাইক্লোন BOB- 1-এর গতিবেগ বেশি থাকলেও, ক্ষয়ক্ষতি এবং নিহতের সংখ্যার দিক থেকে বিচার করলে, বিশ্বের ইতিহাসের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়ের নাম ভোলা।