
শেষ আপডেট: 12 November 2023 17:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোটখাট চেহারা। বাঙালি হিসেবে বেঁটেই বলা যায়। সারা মুখে বসন্তের দাগ। তবে উচ্চতা পুষিয়ে যেত পেশিশক্তিতে। মনোহর আইচের আখড়ায় আকছার দেখা যেত তাঁকে। মুগুর আর ডাম্বেল ভেঁজে ঢকঢক করে খেতেন কাঁচা ডিম গোলা এক গ্লাস দুধ! কলেজ স্ট্রিট বাটার উল্টোদিকে ফুটপাতে ছিল বাবার পানের দোকান। সেখানেই মাঝে মধ্যে বসতেন। লেখাপড়া শেখেননি। চেক কিংবা অন্য কোথাও সই করতে হলে গলদঘর্ম হয়ে যেতেন রীতিমতো। তবে কালীভক্ত ছিলেন ছোট থেকেই। অদূরেই ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি। মঙ্গলারতির সময় প্রায়ই মাতৃমূর্তির সামনে সজল চোখে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত তাঁকে।
চোখ সজল হত ভক্তিরসে। নয়তো কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত এমনিতে কাঁদার লোক ছিলেন না। উল্টে কাঁদিয়ে দিতে জানতেন ভাল মতো। তখন সাতের দশকের শুরুর দিকের উত্তাল সময়। নকশাল আন্দোলন বশে আনতে কালঘাম ছুটছে পুলিশের। বস্তুত, একা লালবাজার পেরে উঠছে না। তখনই ঠিক হয়েছিল, পুলিশ বাহিনীর সমান্তরালে গড়ে তুলতে হবে অক্সিলিয়ারি ফোর্স। উত্তর-মধ্য কলকাতার হাট্টাকাট্টা, শক্তিশালী যুবকদের সামিল করা হয়েছিল সেই ফোর্সে। তাদের কাজ, পাড়ায় পাড়ায় নকশাল যুবকদের উপর নজর রাখা। এমনকী, আন্দোলন দমনে প্রয়োজনে 'অন্য ব্যবস্থা' নেওয়ারও ঢালাও ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছিল খোদ লালবাজার। সেই অক্সিলারি ফোর্স থেকেই উত্থান কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে কেষ্ট ওরফে ফাটাকেষ্টর। অল্প সময়ের মধ্যেই জীবন্ত 'মিথ' হয়ে উঠেছিলেন ফাটাকেষ্ট। সৌজন্যে মূলত তাঁর কালীভক্তি।
বাংলায় 'প্রবাদপ্রতিম' ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার আগে থেকেই কালী পুজো করতেন কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত। নবযুবক সঙ্ঘের সেই পুজো তখন কলবরে নেহাতই পাড়ার ক্লাবের পুজো। শক্তি আরাধনার উদ্যোগে শামিল হতেন কেষ্টর বন্ধুরা। পরে গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনের সেই ছোট্ট পুজোকে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে নিয়ে চলে এসেছিলেন ফাটাকেষ্ট নিজেই। দুর্গাপুজোর ঢঙে সেই পুজোর সজ্জা ও জৌলুসের জন্য অকৃপণ হাতে খরচ করতে শুরু করলেন ফাটাকেষ্ট। তৈরি হল বিশাল মণ্ডপ, চন্দননগরের লাইট শিল্পীদের দিয়ে পুজোর বন্দোবস্ত করালেন কেষ্ট। সঙ্গে ১৬ ফুটের বিশাল প্রতিমা, দেখতে গেলে রীতিমত মুখ তুলে চাইতে হয়। সেই শুরু।
ফাটাকেষ্ট সেই পুজোর নাম লোকমুখে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল গ্রাম গ্রামান্তরে, এমনকী ভিন রাজ্যেও। চন্দননগরের আলোকসজ্জা, চোখ ধাঁধানো মণ্ডপ আর মাঝেমধ্যে দেখতে দূর দূরান্ত থেকে কলকাতায় আসতে শুরু করলেন লোকজন। ক্রমশ আকারে বহরে বাড়তে লাগল পুজো, সঙ্গে জনজোয়ারও। সেই যুগেও নাকি ১২ দিন ধরে মণ্ডপে থাকত প্রতিমা। বিসর্জনের জন্য আয়োজন করা হত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার। সে নাকি দেখার মতো দৃশ্য ছিল!
সীতারাম ঘোষ ট্রিট থেকে ৪-৫ কিলোমিটার দূরেই গঙ্গা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য আয়োজন করা হত একের পর এক লরির। একটি লরিতে তোলা হত মায়ের মূর্তি। বাকি লরিতে থাকত আলোকমালায় সজ্জিত দরজা। ৫০ বছর আগে ফাটাকেষ্টর সেই ভাসান যাত্রা দেখতে নাকি কার্যত জনবিস্ফোরণ হত। যে রাস্তা দিয়ে শোভাযাত্রা যেত তার আশেপাশের রাস্তা, বাড়ি, দোকান, গাছ কোথাও পা ফেলে দাঁড়ানোর জায়গা থাকত না। ঐটুকু রাস্তা যেতে সময় লাগত ঝাড়া ৩ ঘণ্টা! শোনা যায়, এই দৃশ্য দেখতে নাকি ভিন রাজ্য থেকেও লোক আসত। একটি কালীপুজো কার্যত জনশ্রুতিতে পরিণত করেছিল কৃষ্ণচন্দ্র দত্তকে। ততদিনে পিতৃদত্ত নাম ভুলে ফাটাকেষ্ট নামেই পরিচিত হয়ে গেছেন তিনি। ফাটাকেষ্টর সেই পুজোর নাম শোনেননি, এমন লোক বাংলায় পাওয়া যেত না।
ফাটাকেষ্টর পুজোর অন্যতম আকর্ষণ ছিল তারকাদের উপস্থিতি। শুধু টলিউড নয়, বলিপাড়ার নক্ষত্ররাও নাকি হাজির হতেন তাঁর পুজোয়। তখন 'দো আনজানে' ছবির শুটিং চলছে। কলকাতায় এসে গ্র্যান্ড হোটেলে উঠেছেন সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন। খবর পেয়েই সেখানে হাজির হয়ে যান ফাটাকেষ্ট। বম্বের এত বড় স্টার কলকাতায় এসেছেন, তাঁর পুজোয় আসবেন না তা কি হয়?
গ্র্যান্ড হোটেলের ঘরে ৬ ফুটের অমিতাভের মুখোমুখি তখন কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত। বিগ বিকে তাঁর পুজোয় যাওয়ার জন্য করজোড়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন ফাটাকেষ্ট। তাঁর সেই অনুরোধ ফেলবে, এমন সাধ্য কার? তাছাড়া পরিচালক দুলাল গুহ বুঝিয়ে বললেন অমিতাভকে। তারপর আর না করেননি বচ্চন সাহেব। কনভয় নিয়ে সোজা হাজির হয়েছিলেন ফাটাকেষ্টর পুজোয়। এমনিতেই লোকে লোকারণ্য, তার মধ্যে অ্যাংরি ইয়াং ম্যান অমিতাভ কনভয় থেকে নেমে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের সরু রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে মণ্ডপে ঢুকে প্রতিমা দর্শন করলেন। তারপর এসে দাঁড়ালেন মঞ্চের উপর। গানের আওয়াজ ছাপিয়ে তখন শুধুই মানুষের চিৎকার, ভিড়ের চাপে স্টেজ তখন ভেঙে পড়ার উপক্রম!
অমিতাভ এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়েই স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে বললেন 'নমকহারাম' ছবির ডায়লগ। হাততালিতে তখন ফেটে পড়ছে এলাকা। বেশিক্ষণ থাকেননি সুপারস্টার। গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কলকাতা, দার্জিলিংয়ের শ্যুটিং শেষে ফিরেছিলেন মুম্বইতে। তার মাস ঘুরতে না ঘুরতেই ফাটাকেষ্টর কাছে এসে হাজির হলেন দুলাল গুহ। ভেলভেটের বাক্স খুলে তুলে ধরলেন চোখের সামনে। সেখানে যখন জ্বলজ্বল করছে বিরাট হিরে বসানো এক নাকছাবি। জানালেন, বম্বে থেকে অমিতাভ-জয়া উপহার পাঠিয়েছেন, মায়ের জন্য।
বাংলার মেয়ে জামাইয়ের পাঠানো সেই উপহার কালী প্রতিমাকে পরিয়েছিলেন ফাটাকেষ্ট। তবে বেশিদিন যায়নি। কয়েক বছর বাদেই চুরি গিয়েছিল উপহারস্বরূপ পাঠানো সেই নাকছাবি। সারারাত পুজোর পর ভোর হতেই ক্লান্তিতে তখন গা এলিয়ে দিয়েছেন সবাই। সেই সুযোগে পাড়ারই একজন মই বেয়ে উঠে পিছন থেকে মায়ের পিঠ ছাপানো কালো চুল সরিয়ে টুক করে খুলে নেয় নাকছাবি।
জানতে পারার পর হইহই রব পড়ে গেল। পুলিশ এল। বউবাজারের সোনাপট্টির সমস্ত দোকানে ঘুরে ঘুরে খোঁজ নেওয়ার পর শেষমেশ এক ছোট্ট দোকানদার স্বীকার করলেন নাকছাবিটি তাঁর কাছে এসে বেচে দিয়ে গেছে একজন। তবে এর মধ্যেই তিনি সেটি গলিয়েও ফেলেছেন।
বহু ঝামেলা করে শেষ পর্যন্ত হিরেটি উদ্ধার করা গিয়েছিল। সেই হিরে দিয়েই অবিকল অমিতাভের পাঠানো নাকছাবির মতো দেখতে নতুন নাকছাবি তৈরি করা হল। এখনও পর্যন্ত সেই রেপ্লিকা নাকছাবিটিই পরানো হয় মাকে। বাকি সারা বছর ব্যাঙ্কের লকারে থাকে সেটি।