একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্কুলে ঢুকত ছোটরা। সকালবেলা প্রার্থনার লাইনে গলা মেলাত শতাধিক পড়ুয়া। সেই স্কুলই আজ ফাঁকা। বেঞ্চে কেউ বসে না, ক্লাসরুমও খালি পড়ে রয়েছে।

শেষ আপডেট: 30 July 2025 15:05
একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্কুলে ঢুকত ছোটরা। সকালবেলা প্রার্থনার লাইনে গলা মেলাত শতাধিক পড়ুয়া। সেই স্কুলই আজ ফাঁকা। বেঞ্চে কেউ বসে না, ক্লাসরুমও খালি পড়ে রয়েছে।
তুফানগঞ্জ পুরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে তুফানগঞ্জ টাউন বিদ্যাসাগর প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুল এক সময়ে গোটা শহরের গর্ব ছিল। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-শিক্ষাবিদ-নানা রূপে বিকশিত হয়েছে এই স্কুলের পড়ুয়ারা। কিন্তু দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা বদলে গিয়েছে পুরোপুরি। গত বছর পর্যন্ত মাত্র দু’জন পড়ুয়া ছিল। এবছর এপ্রিল পর্যন্ত টিকে ছিল একজন। তারপর সেও চলে গিয়েছে অন্য স্কুলে।
স্থানীয় বাসিন্দা শুভাশিস ধর বললেন, “আমাদের ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই স্কুলে। আজ স্কুলের এই দশা দেখে খারাপ লাগে। চাইছি যাতে ফের স্কুলে ছাত্ররা আসে।” এই স্কুলেরই প্রাক্তনী আইনজীবী শুভময় সরকার। স্মৃতিমেদুর গলায় বললেন, “এই স্কুল থেকেই আমার প্রাথমিক পড়াশোনা। তখন খুব ভালো পড়াশোনা হত। শিক্ষকরা আমাদের খুব যত্ন করে পড়াতেন। স্কুলটাকে এই অবস্থায় দেখতে ভাল লাগে না।”
এই স্কুলের জন্মলগ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন ভানুপ্রকাশ দে। শিক্ষানুরাগী এই মানুষটির নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি শুরু হয় বিদ্যালয়ের পথচলা। প্রথম দিকে তুফানগঞ্জ টাউন গভর্নমেন্ট প্রাইমারি স্কুলে চলত পঠনপাঠন। পরে ৫ নম্বর ওয়ার্ডে নিজস্ব ভবনে স্থায়ীভাবে বসে স্কুল। তখনকার দিনে তুফানগঞ্জের সমস্ত ওয়ার্ড থেকেই ছাত্রছাত্রীরা আসত এই স্কুলে।
১৯৯৫ সালের শিক্ষক দিবসে দিল্লি থেকে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার নিয়ে আসেন তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ভানুপ্রকাশ দে। স্কুলের ঘরে ঘরে তখন গৌরব। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনিই ছিলেন প্রধান শিক্ষক। তখন স্কুলে পড়ুয়া ছিল ৪০০-র বেশি, শিক্ষক ৩ জন। আজ তিনি রোগশয্যায় শুয়ে, চোখে জল নিয়ে বলছেন, “আমার নিজের হাতে তৈরি স্কুলটাকে এই অবস্থায় দেখতে বড় কষ্ট হয়। সুস্থ থাকলে স্কুল বন্ধ হতে দিতাম না। কোনওভাবেই না।”
স্কুল পরিচালন কমিটির সভাপতি অম্লান বর্মা বলেন, “স্কুল ফের চালু করতে আমরা নানা পদক্ষেপ করছি। প্রশাসন ও পুরসভার সহযোগিতা চাইছি। এখনও সব কিছু শেষ হয়ে যায়নি।” স্কুলের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের চেয়ারম্যান রজত বর্মা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে একজন শিক্ষিকা রয়েছেন। তাঁরা চেষ্টা করছেন আরও একজন শিক্ষক নিয়োগ করে ফের স্কুলটিকে চাঙ্গা করে তোলার।
আজও স্কুল ভবনের দেয়ালে টাঙানো আছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, নেতাজি, বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর, মহাত্মা গান্ধীর ছবি। তাঁদের উক্তিতে আজও ঝরে পড়ে আদর্শের আলো। পরিকাঠামোতেও তেমন কোনও ঘাটতি নেই। তবুও পড়ুয়া নেই। নেই পড়া-খেলার হাঁকডাক, নেই মধ্যাহ্নভোজের গন্ধ। তবুও তুফানগঞ্জের প্রাক্তন পড়ুয়া ও সচেতন বাসিন্দারা আশায় বুক বাঁধছেন, যদি আবারও হারানো দিন ফিরে আসে।