অনলাইন নথিভুক্তি আর বাস্তব বেকারত্ব এক জিনিস নয়। কে সত্যিই কাজহীন, কে অস্থায়ী কাজে যুক্ত, কে আয় করছে অথচ নথিতে ‘বেকার’—এই বিভাজন করার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই আর নেই।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স-দ্য ওয়াল।
শেষ আপডেট: 6 February 2026 17:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোটের বছরে আবারও ‘ভাতা রাজনীতি’। বৃহস্পতিবার বাজেট অন অ্যাকাউন্টে যুবসাথী প্রকল্পের (YuboSathi Skim) ঘোষণা করে সেই চেনা পথেই হেঁটেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার (Mamata Banerjee's government) । ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি মাধ্যমিক পাশ বেকারদের মাসে ১৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে চলতি বছরের ১৫ অগস্ট থেকে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতোই এই প্রকল্পও ভোটের আগে জনমন জয়ের হাতিয়ার বলেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তবে ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই যে প্রশ্নটি সামনে এসে পড়েছে, তা আরও গভীর, রাজ্যে আদৌ কে বেকার, সেই তথ্য সরকারের কাছে আছে তো?
এক সময় এই প্রশ্নের উত্তর মিলত এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে (Employment Exchange)। বাম জমানায় অষ্টম শ্রেণি পাশ করা ১৮ থেকে ৪৫ বছরের শিক্ষিত বেকারদের নাম নথিভুক্ত থাকত সেখানে। জেলায় জেলায় অফিস ছিল, তালিকা ছিল, পরিসংখ্যান ছিল। সরকার চাইলে জানত, কতজন কাজহীন। পালাবদলের পরে সেই এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ কার্যত উঠে যায়। বদলে আসে অনলাইন এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক—একটি পোর্টাল, যেখানে নাম নথিভুক্ত করতে হয় নিজ উদ্যোগে। অফিস নেই, মাঠস্তরের যাচাই নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই ডিজিটাল তালিকাই কি রাজ্যের বেকারত্ব চিহ্নিত করার একমাত্র ভিত্তি?
যুবসাথী ঘোষণার পর থেকেই ওই পোর্টালে সার্চ বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন নথিভুক্তি আর বাস্তব বেকারত্ব এক জিনিস নয়। কে সত্যিই কাজহীন, কে অস্থায়ী কাজে যুক্ত, কে আয় করছে অথচ নথিতে ‘বেকার’—এই বিভাজন করার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই আর নেই। সেই ফাঁক দিয়েই কি ভাতা রাজনীতির রাস্তা প্রশস্ত হচ্ছে?
তৃণমূল অবশ্য সে অভিযোগ মানতে নারাজ। দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের বক্তব্য, প্রকল্পের বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ পেলেই সব স্পষ্ট হবে। বিরোধীদের ‘ভাঁওতা’ কটাক্ষ উড়িয়ে দিয়ে তিনি মনে করান, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকেও একসময় ভিক্ষা বলা হয়েছিল, অথচ আজ বিরোধীরাও সেই প্রকল্প নকল করছে। তাঁর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা ঘোষণা করেন, তা বাস্তবায়নের দায়ও নেন।
কিন্তু বাম শিবির প্রশ্ন তুলছে অন্য জায়গায়। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর মতে, কর্মসংস্থান নয়, ভোটই এই প্রকল্পের লক্ষ্য। তিনি মনে করান, ২০১৩ সালে রাজ্যের যুবশ্রী প্রকল্পেও একই রকম ভাতার কথা সরকার ঘোষণা করেছিল. তবে এই প্রকল্পে আদৌ কেউ সুবিধা পেয়েছেন কিনা তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই বলতে পারবেন! তাঁর অভিযোগ, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ তুলে দিয়ে অনলাইন ব্যবস্থায় যাওয়ার মূল উদ্দেশ্যই রাজ্যের প্রকৃত বেকারত্ব আড়াল করা। ফলে সরকার নিজের সুবিধেমতো সংখ্যাই সামনে আনতে পারে।
বিজেপির বক্তব্যেও একই সুর, যদিও ভাষা আরও তীক্ষ্ণ। যুবসাথীকে যুবশ্রীর নতুন মোড়ক বলে আখ্যা দিয়ে বিজেপির অন্যতম মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের অভিযোগ, চাকরি চুরি থেকে উন্নয়নের অর্থ চুরি-এই সরকারের আমলে চুরির তালিকা দীর্ঘ। তাই উন্নয়নের প্রশ্ন এড়িয়ে ভাতা দিয়ে যুব সমাজকে ‘অক্ষম’ করে তোলা হচ্ছে। কাজের সুযোগই আসল, ভাতা নয়, এই যুক্তিতেই তারা ভোটের ময়দানে নামতে চলেছে বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে যুবসাথী প্রকল্প রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দিয়েছে এক পুরনো অথচ অনুত্তরিত প্রশ্ন—বাংলায় আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা আছে, কিন্তু বেকারত্ব চিহ্নিত করার সেই পুরনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কোথায়? সেই উত্তর না মিললে ভাতা ঘোষণার ঝলকানি কতটা বাস্তব, আর কতটা ভোটের আলো, তা নিয়ে সংশয় থাকছেই।