কমিশন যে হঠাৎ করে যে রদবদল করছে এমন নয়। নবান্নের শীর্ষ আমলাদের মতে, গোটা প্যাটার্নটায় একটা বিষয় পরিষ্কার। তা হল রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনে কে কোথায় কোন দায়িত্বে রয়েছেন, তা নিয়ে অবধারিতভাবেই সমীক্ষা করেছে কমিশন।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও সিইও মনোজ আগরওয়াল
শেষ আপডেট: 18 March 2026 21:04
রবিবার বিকেল চারটেয় পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের (West Bengal Assembly Election 2026) দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ECI)। তার ৮ ঘণ্টার মধ্যেই নয়াদিল্লির নির্বাচন সদন থেকে চিঠি পৌঁছে গেছে রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর কাছে। তখন মধ্যরাত। সেই রাতেই নন্দিনী ও স্বরাষ্ট্র সচিবের পদ থেকে জগদীশপ্রসাদ মিনাকে সরিয়ে দেয় কমিশন। দ্য ওয়ালে সেই খবর সবার আগে প্রকাশিত হয়।
মজার ঘটনা হল, খবরটি প্রকাশিত হতে হতেই ফের দিল্লির সূত্র জানায় যে রাজ্য পুলিশের ডিজি পীযূষ পাণ্ডে ও কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদ থেকে সুপ্রতিম সরকারকেও সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরপর ওই দুই বিজ্ঞপ্তিতেই রবি রাতে বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করা গেছিল। স্পষ্ট আন্দাজ করা যাচ্ছিল, এবার জেলা স্তরেও ঢেলে রদবদল (reshuffle) হবে পুলিশ প্রশাসনে। সোম, মঙ্গল ও বুধবার ধারাবাহিকভাবে সেটাই হয়েছে।
এডিজি আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পুলিশি শীর্ষ পদে রদবদল হয়েছে। জেলা স্তরে এসপি বদল হয়েছে। বুধবার সকালে ডিআইজি স্তরে কিছু অফিসারকে সরিয়ে অন্য আইপিএস কর্তাদের আনা হয়েছে। সেই সঙ্গে ১১ জন জেলা শাসককে সরিয়ে সেই পদে অন্য আইএএস অফিসারদের বসিয়েছে কমিশন। শুধু তাই নয়, এ রাজ্যে কলকাতা-সহ মোট ৭টি পুলিশ কমিশনারেট রয়েছে। নজিরবিহীনভাবে সেই ৫ জন পুলিশ কমিশনারকেই সরিয়ে দিয়েছে কমিশন।
এমনকি রাজ্যের সদ্য প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র সচিব জগদীশপ্রসাদ মিনা-সহ একাধিক দফতরের বিভিন্ন দফতরের প্রধান সচিব ও সচিবদেরও অন্য রাজ্যে ভোটের পর্যবেক্ষক করে পাঠানো শুরু করেছে নয়াদিল্লির নির্বাচন সদন। ইতিমধ্যেই কেউ কেউ অন্য রাজ্যে পৌঁছেও গিয়েছেন। যেমন, জগদীশপ্রসাদ মিনা-কে পাঠানো হয়েছে তামিলনাড়ুতে, আইএএস পি মোহন গান্ধীকে পাঠানো হয়েছে কেরলে। খাদ্য দফতরের প্রধান সচিব পার্ভেজ সিদ্দিকিকে পাঠানো হয়েছে তামিলনাড়ুতে।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রথম ধাক্কাতেই রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের ৫ শীর্ষ কর্তাকে কমিশন সরিয়ে দেওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিল লিখেছিলেন। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ ছিল, কমিশন এক তরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কাউকে সরিয়ে সেখানে অন্য কাউকে বসানোর আগে রাজ্যের কাছে বিকল্প নাম চাইছে না। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এটা চলতে পারে না। ভোট হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু সরকারকে তো কাজটা করতে হবে।
কিন্তু দেখা গেল, কমিশন তাতে কর্ণপাতও করেনি। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কমিশনের কৌশলটা কী?
কমিশনের শীর্ষ সূত্রে বলা হচ্ছে, বাংলায় বিরোধী সবকটা রাজনৈতিক দল মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে অভিযোগ করেছেন, রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনের একাংশ পক্ষপাতদুষ্ট। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পদে যে সব পুলিশ কর্তা বা আমলারা রয়েছেন, তাঁদের অনেকেই শাসক দলের অ্যাজেন্ডা বহন করছে। সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গেছে, দুই আইপিএস কর্তা অবসর নিয়ে সরাসরি শাসক দলে যোগ দিয়েছেন। এই অবস্থায় কমিশন আর রাজ্যের সচিবালয়ের উপর ভরসা করতে পারছে না।
কমিশন সূত্রে খবর, রাজ্য পুলিশ প্রশাসনে বোঝাপড়ার শৃঙ্খলটাই ভেঙে দিতে চাইছে কমিশন। ভোটের ঠিক আগেই জেলা ধরে ধরে রদবদল করেছে রাজ্য সরকার। জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারদের বেছে বেছে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়েছে। সেই তাল-মিল বোঝাপড়ার সমীকরণটাই ঘেঁটে দিতে চাইছে কমিশন। বরং যোগ্য সব যোগ্য আমলা ও পুলিশ কর্তাদের দায়িত্ব দিচ্ছে যাঁরা বর্তমান সরকারের আমলে তথাকথিতভাবে শাসকের গুড বুকে ছিলেন না।
কমিশনের এক কর্তার কথায়, শাসক দল তথা সরকারের ধারণা ছিল, শীর্ষ পদে বদলের জন্য কমিশন নবান্নের থেকে তিন জন করে বিকল্প নাম চাইবে। কমিশন মনে করেছে, এই প্রথাগত ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে শীর্ষ পদগুলিতে সেভাবেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছিল। যেমন, লোকসভা ভোটের আগে হঠাৎ করে আইপিএস কর্তা সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়কে ডিজি ফায়ার সার্ভিস করা হয়। ভোটের সময়ে রাজ্য পুলিশের ডিজি পদ থেকে রাজীব কুমারকে সরানোর সময়ে নবান্নের কাছে তিনটি বিকল্প নাম চাওয়া হয়। নবান্ন যে তিনটি নাম দিয়েছিল, তার মধ্যে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের নাম ছিল। কিন্তু এবার সেই চেনা ছকেই পড়তে চায়নি কমিশন। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার রয়েছে বলেই সিইও দফতরের দাবি।
কমিশন যে হঠাৎ করে যে রদবদল করছে এমন নয়। নবান্নের শীর্ষ আমলাদের মতে, গোটা প্যাটার্নটায় একটা বিষয় পরিষ্কার। তা হল রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনে কে কোথায় কোন দায়িত্বে রয়েছেন, তা নিয়ে অবধারিতভাবেই সমীক্ষা করেছে কমিশন। তার পরই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। এ ঘটনা শুধু বেনজির নয়, বরং এটাও বোঝাচ্ছে ভোটের আগে এরকম আরও কঠোর পদক্ষেপ করবে নির্বাচন সদন এবং সিইও দফতর।