সোমবার প্রশাসনিক বৈঠকের জন্য বীরভূম সফরে যাবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মনে করা হচ্ছে, এই সফরে দেউচা পাচামি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও রিভিউ মিটিং করবেন মুখ্যমন্ত্রী।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 27 July 2025 19:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জোর করে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে আন্দোলন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তাঁর সেই জমি আন্দোলনের অভিঘাত এমনই ছিল যে শতাব্দী প্রাচীণ অধিগ্রহণ আইন ও পুনর্বাসন নীতির সংশোধন করেছিল কেন্দ্রের সরকার। তবে এ প্রশ্নও উঠেছিল, বাংলায় যেখানে এক লপ্তে বড় জমি অপ্রতুল, সেখানে কি শিল্পের জন্য আর জমি অধিগ্রহণ সম্ভব হবে?
বীরভূমের দেউচা পাচামির কয়লা খনিতে কাজ চলছে...#mamatabanerjee #westbengalnews #Deucha #BanglaNews #coalmine #birbhum #birbhumnews #deuchanews pic.twitter.com/T4tQ13HL3A
— The Wall (@TheWallTweets) July 27, 2025
জবাব দিল দেউচা পাচামি (Deucha-Pachami-Dewanganj-Harisingha - DPDH)। দেশের বৃহত্তম কয়লা খনি প্রকল্প এটি। ৩,৩০০ একরেরও বেশি জমি জুড়ে এই প্রকল্প। প্রথম দফায় এরই মধ্যে ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ফেলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই সঙ্গে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণে এক প্রকার মাইলফলক তৈরি হয়েছে পিডিসিএল। জোর করে কারও বসত বা ভিটে ভাঙা হয়নি, কারও উপর লাঠিও ওঠেনি। বরং জমি দেওয়ার শর্তে এখনও পর্যন্ত সরকারি চাকরি দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৫০০ জনকে।

কীভাবে সম্ভব হল এই অসাধ্যসাধন?
বাংলায় সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “শিল্প হবে, কিন্তু মানুষের পাশে নিয়েই তা হবে”। দেউচা পাচামিতে জমি অধিগ্রহণের জন্য সেই দর্শন নিয়েই পা ফেলেছে পিডিসিএল বা পশ্চিমবঙ্গ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (WBPDCL)।
সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ভুল ছিল, কৃষকদের সঙ্গে কোনও আগাম আলোচনা না করা। যা নিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমাদের তো কৃষকসভা রয়েছে, তাদের সঙ্গে একবারও কথা বলা হল না কেন? দেউচা পাচামিতে হয়েছে উল্টোটা। গ্রামসভা ডেকে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পিডিসিএলের কর্তাদের দাবি, তাঁরা বিশেষ করে পরিবারের মহিলাদের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছেন।
পরিবারভিত্তিক চাহিদা জানার পর কেউ চাইলে নগদ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, কেউ চাইলে দেওয়া হয়েছে নতুন ঘর বা দোকান।
যে সব পরিবার জমি দিয়েছে তাদের পরিবার পিছু একজনকে চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
৪০টিরও বেশি আদিবাসী গ্রামে মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী চালিয়ে বোঝানোর কাজ হয়েছে।
এমনকি স্থানীয় মানুষের আবেগ ও আস্থা অটুট রাখতে এ মহুয়া, অর্জুন, শাল ইত্যাদি মিলিয়ে ৯৮৮টি গাছ খনি এলাকার বাইরে স্থানান্তরিত করা হয়।
এভাবে স্থানীয়দের আস্থা অর্জনের পরই জমি অধিগ্রহণে হাত দিয়েছে পিডিসিএল। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে দেউচা-পাচামিতে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে কোনও বড় অসন্তোষের ঘটনা এখনও দেখা যায়নি।
একসময়ে কোল ইন্ডিয়ার (Coal India Ltd - CIL)-এর অধীনে ছিল এই দেউচা-পাচামি ব্লক। কিন্তু তারা ২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্প শুরু করতে ব্যর্থ হয়। পরে সেটি ছয় রাজ্যের যৌথ উদ্যোগকে (যেমন পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, ছত্তিশগড় প্রভৃতি) এই প্রকল্প হস্তান্তরিত করা হয়। কিন্তু তারা ২০১৯ সাল পর্যন্ত কিছুই করতে পারেনি। এরপর কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক প্রকল্পটি ফের নিজেদের হাতে নেয় এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পিডিসিএলের মাধ্যমে দায়িত্ব দেয়।
দেউচা পাচামিতে এখনও পর্যন্ত কাজের যা অগ্রগতি হয়েছে—
১) দেউচা পাচামি কয়লা ব্লক নিয়োগ : এখনও পর্যন্ত জুনিয়র পুলিশ কনস্টেবল পদে ৮৭৭ জন এবং গ্রুপ-ডি পদে ৬০৫ জনকে সরকারি চাকরি দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন তফসিলি জাতি ও প্রায় ৭০০ জন তফসিলি উপজাতি শ্রেণির।
২) ৫৮৯.৪৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। প্রতি একর জমির জন্য ৩৯ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রায় ৪৭০০ জন রায়ত সম্মতি ফর্মে সই করেছেন।
৩) বসতবাড়ি ও পুনর্বাসন: ভূমি হারানো পরিবারগুলির জন্য ৭০০ বর্গফুটের বাড়ি-সহ মডেল পুনর্বাসন কলোনি গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। থাকবে পানীয় জল, বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট, উপাসনাস্থল ও কবরস্থান।
৪) বেসল্ট খনন শুরু: কয়লাখনি এলাকায় মোট ৩২৬ একর জায়গায় বেসল্ট পাথর খননের অনুমতি মিলেছে। প্রথম ধাপে ১২ একরে খনন শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। ৭১.৫% রাজস্ব শেয়ারের ভিত্তিতে চুক্তি হয়েছে, যা রাজ্যে এই খাতে সর্বোচ্চ।
৫) বিশ্বমানের খনন পদ্ধতির সন্ধান: ভূতাত্ত্বিক প্রতিবেদন অনুসারে, এই ব্লকের ৮০% কয়লা মজুত রয়েছে ৩০০ মিটারের বেশি গভীরে, যার ওপরে রয়েছে ২০০ মিটার পুরু বেসল্ট স্তর। তাই ওপেন কাস্ট নয়, লাগবে আন্ডারগ্রাউন্ড খনন।

কী আছে এই কয়লাখনি ব্লকে?
এই ব্লকে কয়লার মোট সম্ভার ১২০০ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি। এটি মূলত G9 গ্রেডের কয়লা, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত।
জিওলজিকাল রিপোর্ট অনুযায়ী ব্লকে রয়েছে ৪টি কয়লা স্তর। আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিংয়ের মাধ্যমে এই কয়লা তুলতে হবে।

ভূ-তাত্ত্বিক পরীক্ষায় ১০৯টি বোরহোল খুঁড়ে ৬০,২৮১ মিটার ড্রিলিং সম্পন্ন হয়েছে রেকর্ড সময়ে।
জিওলজিকাল রিপোর্ট ও কনসেপচুয়াল মাইনিং প্ল্যান (Conceptual Mining Plan) প্রস্তুত হয়েছে। পরবর্তী ধাপে আন্ডারগ্রাউন্ড খননের জন্য গ্লোবাল বিডিং ডাকা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ৬টি সংস্থা অংশ নিয়েছে। যার মধ্যে পোল্যান্ডের একটি সংস্থাও রয়েছে। চূড়ান্ত বাছাই আগস্ট-সেপ্টেম্বরে হবে।
বেসল্ট খননের জন্য দরকারি ক্লায়েন্ট সংস্থাগুলির সঙ্গে মিটিং হয়েছে, যাতে রাজ্য সরকার নিজেই এই খনি থেকে পাথর সংগ্রহ করতে পারে।
সোমবার প্রশাসনিক বৈঠকের জন্য বীরভূম সফরে যাবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মনে করা হচ্ছে, এই সফরে দেউচা পাচামি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও রিভিউ মিটিং করবেন মুখ্যমন্ত্রী।