প্রশান্ত কিশোরের কথায়, ২০১৪ সালের ভোটার তালিকাই যদি ভুয়ো হয়, তাহলে নরেন্দ্র মোদী কীভাবে প্রধানমন্ত্রী হলেন? গত লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত যে তালিকায় কোনও সমস্যা ছিল না, হঠাৎ করে আজ তা বদলানোর প্রয়োজন কেন? বিজেপি আসলে ভীত।

প্রশান্ত কিশোর ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 27 July 2025 08:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারের ভোটার তালিকা নিয়ে বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া (Special Intensive Revision - SIR) শুরু হওয়া মাত্রই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। এবার সেই বিতর্কে আগুন ধরিয়েছেন প্রশান্ত কিশোর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতই তাঁর সপাট অভিযোগ, এটা বিজেপির চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র। দিদির মতই পিকে মনে করছেন, কমিশন বিজেপির হাতে তামাক খাচ্ছে। বলা ভাল, তামাক সেজে দিচ্ছে বিজেপি খাচ্ছে কমিশন।
প্রশান্ত কিশোরের কথায়, “২০১৪ সালের ভোটার তালিকাই যদি ভুয়ো হয়, তাহলে নরেন্দ্র মোদী কীভাবে প্রধানমন্ত্রী হলেন? গত লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত যে তালিকায় কোনও সমস্যা ছিল না, হঠাৎ করে আজ তা বদলানোর প্রয়োজন কেন? বিজেপি আসলে ভীত। কারণ বিহারে এখন মানুষ এখন বিকল্প খুঁজছে। সেই ভয় থেকেই ভোটারদের নাম কেটে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
বিহারের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা কিশনগঞ্জে দাঁড়িয়ে সম্প্রতি প্রশান্ত কিশোর এ কথা বলেছেন। পিকে জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম ভুলভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে, তাদের পাশে থাকবে তাঁর পার্টি। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিজেপির এই পদক্ষেপ সংবিধানবিরোধী, কারণ নাগরিকত্ব নির্ধারণের অধিকার নির্বাচন কমিশনের নেই — সুপ্রিম কোর্ট তা স্পষ্ট করেছে।
পিকে অবশ্য শুধু বিজেপিকেই নয়, বিহারের সংখ্যালঘু রাজনীতির পুরনো খেলোয়াড় তথা লালু প্রসাদের দল আরজেডিকেও কটাক্ষ করেছেন। তাঁর কথায়, “আরজেডি নিজেদের লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখতে মুসলিমদের স্রেফ কেরোসিন হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু এবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সেই অপমান মেনে নেবে না।” জানিয়ে রাখা ভাল, লালু প্রসাদের দলের নির্বাচনী প্রতীক হল লন্ঠন।
বিহারে সংখ্যালঘু জনভিত্তিকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসাবে ব্যবহারের বিষয় যেমন লালুর দলের সঙ্গে জড়িয়ে তেমনই বাংলায় অনেকেই মনে করেন, তৃণমূলের বড় জিয়নকাঠি হল সংখ্যালঘু ভোট। ভোটার তালিকায় সংশোধনের প্রশ্নে বিজেপি সেই জায়গাতেই আঘাত করতে চাইছে। যেমন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এদিনও বলেছেন, বাংলার ভোটার তালিকায় ১ কোটি রোহিঙ্গা রয়েছে। এই সব বিদেশি ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে, তাই ফুস হয়ে যাবে তৃণমূল।
আবার কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তৃণমূল সাংসদদের মতে, বিজেপি সাজিয়েই রেখেছে কাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। বাংলার প্রান্তিক মানুষ ও মুসলমানদের ওরা টার্গেট করেছে। ওরা যেভাবে সাজিয়ে দিয়েছে সেভাবেই কমিশন ভোটার লিস্ট ফাইনাল করবে।
নির্বাচন কমিশনের সাফাই—
বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধনের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে সুপ্রিম কোর্টে একটি পাল্টা হলফনামা দাখিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ECI)। কমিশনের বক্তব্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল — যেমন আম আদমি পার্টি (AAP), কংগ্রেস, বিজেপি, এআইএডিএমকে এবং শিবসেনা — ভোটার তালিকার ভুলত্রুটি নিয়ে বহু অভিযোগ জানিয়েছে। এই অভিযোগগুলির ভিত্তিতেই কমিশন "ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে" এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR) শুরু করেছে।
কমিশনের হলফনামা অনুযায়ী, একাধিক রাজনৈতিক দল অভিযোগ করেছে যে ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তি, অনুপস্থিত বা অযোগ্য ভোটারের নাম রয়েছে, আবার অনেক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ে গেছে। পুরনো সারাংশ সংশোধন পদ্ধতি এই সমস্যাগুলি দূর করতে পারছে না — এই যুক্তিতে কমিশন নতুন করে সম্পূর্ণ তালিকা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কমিশন তাদের হলফনামার সঙ্গে ৬২৫ পাতার একটি সংযোজন দাখিল করেছে, যেখানে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে আপ-এর অভিযোগ, মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস-জোটের অভিযোগ, এবং বিজেপি ও অন্যান্য দলের দাবি-আপত্তি সংযুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার ২৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের দায়ের করা মামলার শুনানি হবে। এর মধ্যেই প্রথম ধাপের সংশোধনে বিহারে প্রায় ৬৬ লক্ষ নাম খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে — যার মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা দ্বৈত ভোটাররাও রয়েছেন। যদিও এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে বিহারের রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে — একদিকে কংগ্রেস, তৃণমূল, আরজেডি, প্রশান্ত কিশোরের অভিযোগ, অন্যদিকে কমিশনের প্রতিরক্ষা — যার নিষ্পত্তি আপাতত সুপ্রিম কোর্টের উপরই নির্ভর করছে।