
শেষ আপডেট: 16 July 2023 15:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সপ্তাহভর নাগাড়ে বৃষ্টিতে কার্যত জলের তলায় রাজধানী দিল্লি। সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে শুরু করে লাল কেল্লার কাছে কাশ্মীরি গেট এলাকা, সর্বত্রই উঠে এসেছে যমুনার জল। ৬টি জেলা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে, নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্তত ২৫ হাজার মানুষকে (Delhi Flood)।
কিন্তু হঠাৎ এই পরিস্থিতি হল কেন? আপাত নিরীহ যমুনা, যা কিনা মরা নদী বললেও অত্যুক্তি হয় না, সেই যমুনার জল দিল্লিকে তো ভাসিয়েছে বটেই, পার্শ্ববর্তী আগ্রাতেও নাকি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যমুনার কারণেই (Planning Mistake That Drowned Delhi)। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর পিছনে কারণ হল এক ঐতিহাসিক ভুল, যা করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৭ দশক আগে। শহর তৈরির পরিকল্পনার গোড়াতেই নাকি রয়েছে এমন গলদ, যার কারণেই আজ এমন বানভাসি রাজধানী।
দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির প্রাক্তন কমিশনার একে জৈনের দাবি, স্বাধীনতার পর দিল্লি শহর তৈরির মাস্টার প্ল্যান করা হয়েছিল ১৯৬২ সালে। সেই সময় বন্যাপ্রবণ যমুনা সংলগ্ন এলাকাকে 'ফাঁকা জায়গা' হিসেবে দেখা হয়েছিল। আর সেটাই অন্যতম বড় ভুল ছিল বলে দাবি জৈনের।
'গত ১০০০ বছরে দিল্লি একাধিকবার ভাঙাগড়ার সম্মুখীন হয়েছে। শহরের একদিকে রয়েছে যমুনা, এবং অন্যদিকে রয়েছে শৈলশিরা (ridge)। এই দুইয়ের মধ্যস্থিত দিল্লিকে গড়ে তোলা ভৌগলিক দিক থেকে অন্যতম চ্যালেঞ্জের কাজ বলেই মনে করেন জৈন।
ব্রিটিশ শাসকরা যখন যমুনার তীরবর্তী দিল্লিকে রাজধানী করবে বলে স্থির করেছিল, তখনও যে বন্যার ঝুঁকি ছিল, সে কথা স্বীকার করেছিলেন ব্রিটিশ স্থপতি এডওয়ার্ড লুটিয়েন্স। বন্যপ্রবণ এবং ম্যালেরিয়া জর্জরিত এই শহরকে রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার ঝুঁকির কথা জানা সত্ত্বেও সেখানে পুরোদমে বসতি গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল, কারণ ততদিনে রাজা পঞ্চম জর্জ শহরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে ফেলেছেন।
তবে শেষমেশ প্রায় ১০০ বর্গ কিলোমিটারের একটি এলাকা সংরক্ষিত করা হয়েছিল, সেটির নাম নাম দেওয়া হয়, জোন জিরো। এই এলাকায় নতুন করে কোনও প্রকার নির্মাণ কাজ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও অন্তত ১০০টি অনুমোদনহীন কলোনি তৈরি হয়েছে সেখানে, দাবি ডিডিএ-র প্রাক্তন কমিশনারের।
এতেই শেষ নয়। জৈনের দাবি, দিল্লির মাস্টার প্ল্যানের সাম্প্রতিকতম পরিকল্পনা এই সমস্যা কমানো তো দূর, বরং আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন পরিকল্পনা মোতাবেক, নদী তীরবর্তী মাত্র ৬৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে যমুনা অঞ্চল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যে অংশটিতে নির্মাণ পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বাকি জায়গা, যেখানে অননুমোদিত কলোনি গড়ে উঠেছে, সেখানে সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলবে।
এতেই বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে মনে করছেন জৈন। এছাড়া দিল্লির নিকাশি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে পরিমার্জন করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। নদীর জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় শহরের জল নদীতে গিয়ে পড়ছে তো না-ই, বরং নদীর জল সেই নিকাশি নালা দিয়েই উঠে আসছে শহরে, জানিয়েছেন তিনি।
জৈন জানিয়েছেন, দিল্লি নিকাশি ব্যবস্থায় পরিকল্পনা যখন করা হয়েছিল তখন শহরের জনসংখ্যা ছিল ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ। আজ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দু'কোটিতে। নিকাশি ব্যবস্থা সংস্কারের পাশাপাশি বৃষ্টির জল মাটিতে প্রবেশ করার জায়গা রাখাও অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি। 'এর জন্য বিল্ট আপ এরিয়া যথাসম্ভব কম রাখতে হবে,' দাবি তাঁর।
উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৭১ সালে শেষবার এমন বিধ্বংসী বন্যা হয়েছিল দিল্লিতে। ৪৫ বছর আগের সেই বন্যায় প্রায় একই রকম ফুঁসে উঠেছিল যমুনা। তবে এবারের পরিস্থিতি আরও ভয়ানক। প্রবল বন্যায় রিং রোডের সিভিল লাইন, মঞ্জু কা টিলা, কাশ্মীরি গেট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এই এলাকা মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাসভবন থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে। কাশ্মীরি গেট লাগোয়া এলাকাতেই রয়েছে দিল্লি বিধানসভা। বোট ক্লাব, মনস্ট্রি মার্কেট, যমুনা বাজার, গীতা ঘাট, খাড্ডা কলোনি, থেকে শুরু করে ওয়াজিরাবাদ, ময়ূর বিহার, সব এলাকাই জলমগ্ন। তবে আজ রবিবার খানিকটা নেমেছে যমুনার জলস্তর। যদিও এখনও পর্যন্ত তা বিপদসীমার উপরেই রয়েছে। তবে রাতের মধ্যে জল আরও একটু নামবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আজ নিজে বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনে বেরিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ইতিমধ্যেই জায়গায় জায়গায় ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। বন্যায় যাঁরা আধার কার্ড, প্যান কার্ড এবং সমতুল্য গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়েছেন, তাঁদের তা নতুন করে তৈরি করে দেওয়ার জন্য খুব শিগগিরই আলাদা ক্যাম্প খোলা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বাবার সম্পত্তিতে সমান অধিকার কন্যাদেরও, ২০০৫-এর সংশোধনী আইন মনে করাল ওড়িশা হাইকোর্ট