দার্জিলিং কালিম্পংয়ের সেই কমলালেবু (Darjeeling Mandarin orange) এতদিনে জিআই ট্যাগ (GI or Geographical Indication tag) পেল।

শেষ আপডেট: 2 December 2025 15:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন—“আবার যেন ফিরে আসি/ কোনো এক শীতের রাতে/ একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে/ কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।” সম্ভবত দার্জিলিংয়ের কমলালেবুর (Darjeeling Orange) কথাই বলেছিলেন তিনি। সে সময়ে নাগপুরের কমলা কলকাতায় বিশেষ আসত না। হিমাচলের কিন্নুরও জন্ম হয়নি তখনও। দার্জিলিং কালিম্পংয়ের সেই কমলালেবু (Darjeeling Mandarin orange) এতদিনে জিআই ট্যাগ (GI or Geographical Indication tag) পেল।
কেন দার্জিলিং ম্যান্ডারিন পেল জিআই ট্যাগ?
পাহাড়ি হাওয়া, সিক্ত মাটি, নির্দিষ্ট উচ্চতা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ের কমলালেবুর পরিচয় অনন্য। বাংলা ও বাঙালির শৈশব, শীতকাল, ত্বকের চর্চা, ছোটবেলার খুনসুটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে ‘ক্যুইন অফ দ্য হিলস’ (Queen of the hills)। এতদিনের সেই সরেস ফল দার্জিলিং ম্যান্ডারিনকে (Citrus reticulata Blanco) আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই ট্যাগ দিয়েছে ভারতের জিআই রেজিস্ট্রি। এটি পশ্চিমবঙ্গের ১১তম কৃষিজ পণ্য, যা জিআই স্বীকৃতি পেল। জিআই ট্যাগ (GI Tag) সাধারণত সেই সব পণ্যকে দেওয়া হয় যেগুলির স্বাদ, গুণমান, গঠন ও খ্যাতি নির্ভর করে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানের উপর**। দার্জিলিং ম্যান্ডারিন বহু দিক থেকে সেই মানদণ্ড পূরণ করেছে—
১. প্রাকৃতিক ভৌগোলিক অবস্থানের বিশেষত্ব
দার্জিলিং–কালিম্পংয়ের পাহাড়ি অঞ্চল ৬০০–১৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত, যেখানে—তাপমাত্রা থাকে মৃদু ঠান্ডা, বৃষ্টিপাত পর্যাপ্ত, পাহাড়ি লালমাটি সমৃদ্ধ খনিজে এবং দিনের আলো ও রাতের ঠান্ডার তারতম্য ফলকে দেয় অতুলনীয় সুগন্ধ। এই সব মিলিয়েই তৈরি হয় দার্জিলিং ম্যান্ডারিনের সুগন্ধ ও মিষ্টি–টক অনন্য স্বাদ।
২. বৈজ্ঞানিক গঠন ও স্বাদের ভিন্নতা: বৈজ্ঞানিকভাবে দার্জিলিং ম্যান্ডারিনের পরিচয় হল— সিট্রাস রেটিকুলাটা (Citrus reticulata)। জিআই জার্নালে দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—
গড় ওজন: ১২৪ গ্রাম। খোসা পাতলা, সহজে ছাড়ানো যায়। রসের পর্যাপ্ততা ৪৫–৫০%। মিষ্টত্ব ৯.৫ থেকে ১১ ব্রিক্স (Brix)। অ্যাসিডিটি ০.৬৬%। ভিটামিন সি ২৮ মিলিগ্রাম/১০০ মিলি। রঙ—গাঢ় কমলা। গন্ধ—বিশেষ পাহাড়ি সাইট্রাস অ্যারোমা। এত উচ্চমাত্রার রস, মিষ্টি–টক ভারসাম্য এবং সূক্ষ্ম সুগন্ধ ভারতের অন্য কোনও কমলালেবুতে পাওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নাগপুর কমলালেবুর থেকেও বেশি সুস্বাদু ও রসাল।
৩. সহজে খোসা ছাড়ানো যায়, নরম পাল্প, কম বীজ। বীজ সংখ্যা ৫-এর কম।
৪. গাছ বেড়ে ওঠার অনন্য ধরন। দার্জিলিংয়ের কমলালেবু গাছ মাঝারি হাইটের হয়। ঘন পাতাযুক্ত গাছে জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি ফুল ফোটার সময়। অক্টোবর–ডিসেম্বর ফল সংগ্রহের সময়। এই নির্দিষ্ট কৃষি–চক্রও ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
দার্জিলিংয়ের কমলার ইতিহাস (History of Darjeeling Mandarin)
দার্জিলিং ম্যান্ডারিনের ইতিহাসের লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়। ১৯০৭ সালে বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটে তা প্রকাশিত হয়েছিল (L.S.S. O’Malley-র Bengal District Gazetteers — Darjeeling 1907)। পরেও একবার তা গেজেটে প্রকাশিত হয় ১৮৩৫ সালে (E.C. Dozey-র A Concise History of the Darjeeling District Since 1835- 1922)। দুটি বইতেই উল্লেখ আছে—দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ে প্রচুর কমলা উৎপাদন হত। এগুলি কলকাতায় রফতানিও করা হত। স্থানীয় অর্থনীতির বড় ভরসা ছিল পাহাড়ি কমলা।
দার্জিলিং ম্যান্ডারিন: ভারতের সাইট্রাস মানচিত্রে আলাদা জায়গা
ভারতে উৎপাদিত সব কমলালেবুর মধ্যে—ম্যান্ডারিন শ্রেণির এলাকাভিত্তিক চাষ সবচেয়ে বেশি (৪৩%)। এর মধ্যে দার্জিলিং ম্যান্ডারিন এবং খাসি ম্যান্ডারিন—দুইটি উচ্চমানের হিল–অরেঞ্জ। দার্জিলিংয়ের ফলের গন্ধ, রসালো পাল্প, মিষ্টি–টক ভারসাম্য, পাতলা খোসার কারণে বিশেষ চাহিদা রয়েছে।
দার্জিলিংয়ের জিআই ট্যাগ অর্জনে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রফেসর তুলসী শরণ ঘিমিরে। তিনি উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তাঁর কথায়,“জিআই স্বীকৃতি আমাদের প্রথম সাফল্য। এখন লক্ষ্য—ফসলের উৎপাদন বাড়ানো এবং সারা দেশের বাজারে দার্জিলিং ম্যান্ডারিনকে আরও শক্তিশালী ভিতের উপর দাঁড় করানো।”