দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঢেঁকি নাকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। তাহলে কৃষকরা প্রতিবাদ-বিক্ষোভে গেলে কি ফসল ফলাবেন না! অবশ্যই ফলাবেন। ঠিক তেমনটাই হয়েছে দিল্লির বুরারি ময়দানে। প্রতিবাদ সেখানে চলছে প্রতিবাদের মতোই, কিন্তু তার সঙ্গেই দিব্যি মাথা তুলেছে পেঁয়াজকলির চারা, ভুট্টা, শীতকালীন বেশ কিছু সবজি। সেই সঙ্গেই হাওয়ায় দুলছে সারিসারি সূর্যমুখীর দল। দেখে বোঝার উপায় নেই, এটাই নাকি বিক্ষোভস্থল। বিদ্রোহী কৃষকরা যেন অবসর কাটাচ্ছেন ফসল ফলিয়ে!
প্রায় দেড় মাস সময় ধরে দিল্লির সিঙ্ঘু ও তিকরি বর্ডারে কৃষিবিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-জমায়েত চালাচ্ছেন উত্তর ভারতের হাজার হাজার কৃষক। দিনের পর দিন এভাবে সীমান্ত অবরুদ্ধ রাখা যেতে পারে না, এই দাবি করে সরকার কৃষকদের অনুরোধ করে, তাঁরা যেন বুরারির খোলা ময়দানে গিয়ে জমায়েত করেন। যদিও এ প্রস্তাবে প্রথমে রাজি হননি কৃষকরা। তাঁরা জানিয়ে দেন, বর্ডার ছাড়লে আন্দোলন কমজোরি হয়ে যাবে। বুরারি মাঠকে 'খোলা জেলখানা' বলে উল্লেখ করে তাঁরা জানান, সরকার তাঁদের কোণঠাসা করতে চাইছে।

তার পরেও দেখা যায়, খুব কম সংখ্যক কৃষক, সংখ্যা ৪০০ মতো হবে বড়জোর, তাঁরা বুরারির মাঠে এসে জমা হন। হয়তো কড়া ঠান্ডার কারণেই হোক বা অন্য জায়গাতেও প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই হোক, বুরারির ময়দান জমে ওঠে প্রতিবাদে-বিক্ষোভে।
২৪ বছরের তরুণ প্রতিবাদী কৃষক জগদীপ সিং পঞ্জাবের ফরিদকোট থেকে এসেছেন। অদূরে টাঙানো একটি ভলিবল নেটের দিকে দেখিয়ে বলছিলেন, "দিন দশেক আগে একজন ব্যক্তি দিল্লি থেকে এই নেটটা আমাদের দিয়েছেন। তার পর থেকে শীতের বিকেলে খেলছি আমরা। কী করব, খালি হাতে তো বসে থাকতে পারি না। আমাদের রক্তেই আছে পরিশ্রম করা। তাই আমরা কয়েক জন মিলে ঠিক করি, ছোট করে চাষবাসও শুরু করব। তার পরেই এই সবজিগুলো ফলেছে।"

৪২ বছরের গুরুদেব সিং মাঙ্গা আবার মনে করিয়ে দিলেন, "এই যে পেঁয়াজ চাষ হচ্ছে, তা পরিপূর্ণ হতে কিন্তু ৬০ দিন লাগবে। ফলে আমরা খুব শিগ্গিরি প্রতিবাদের জমি ছাড়ছি না, এটা তারই প্রতীক।"
অন্য প্রান্তে ৫৮ বছরের জাসকরণ সিং কাহান জমিয়ে বসেছেন পরিবার নিয়ে। ফিরোজপুর থেকে এসেছেন তিনি। ভুট্টা, পালং, টোম্যাটো চাষ করছেন মনের সুখে। তাঁর কথায়, "এই তো সবে শুরু, শীত কমলেই ধানও চাষ করব। আরও সবজি ফলাব। আমরা এখানে নিজেদের খাবার ব্যবস্থা নিজেরাই করে নেব। এই জমিটাও ভাল, রাসায়নিক সার ছাড়াই ফসল ফলছে দিব্যি।"

৩২ বছরের পিন্দারজিত কৌর শ্বশুরমাশাইয়ের সঙ্গে চলেছে এসেছেন বর-বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে। সব মিলিয়ে ১০ জনের সংসার এক টেন্টের অন্দরে। ম্যাট্রেস পেতে ঘুমোচ্ছেন সেখানেই। মুশকিল হচ্ছে, বৃষ্টি পড়লে ভেজা মাটিতে ভিজে যাচ্ছে ম্যাট্রেসও। এই শীতে বাচ্চাদের ভারী কষ্ট।
কষ্টের 'সংসারে'ই দিন পেরোচ্ছে একটা একটা করে। রোদ ওঠেনি টানা কয়েক দিন। বাতাসে বিষণ্ণতা ক্রমে ভারী হচ্ছে। সন্ধে বাড়লেই আগুন জ্বলে ওঠে ইতিউতি, আগামীর আশায় হাত সেঁকে নেন সকলে। আর এসবের মধ্যেই তিলেতিলে বাড়চে ঘামঝরানো ফসলগুলোও, যেন বার্তা দিচ্ছে সৃষ্টির।