বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনা, নাকি পর্যাপ্ত সংখ্যক চার্জিং স্টেশন তৈরির জন্য অপেক্ষা করা, কোনটা আগে--এ নিয়ে বহু আগ্রহী ক্রেতা বিভ্রান্ত থাকেন। আবার চার্জিং স্টেশন যে একেবারে হচ্ছে না এমন নয়। কিন্তু সেই তথ্যই ঠিকমতো আমজনতার মাঝে পৌঁছয় না।

নিউটাউনের সুখবৃষ্টির চার্জিং স্টেশন।
শেষ আপডেট: 22 January 2026 20:36
বৈদ্যুতিক গাড়ি হয়তো কেনা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাড়ির বাইরে বা দূরে কোথাও সেই গাড়ি নিয়ে গিয়ে মাঝপথে চার্জ দেওয়ার প্রয়োজন পড়লে কী হবে? যদি চার্জিং স্টেশন কোথায় জানা না থাকে? বিপদে পড়তে হবে নাকি! কিন্তু কেমন হয়, যদি সেই তথ্য আগাম হাতের মুঠোর ফোনেই জেনে নেওয়া যায়?
অন্তত এ রাজ্যের কোথায় কয়টি চার্জিং স্টেশন রয়েছে, তার মধ্যে কোথায় চার্জ দেওয়ার পয়েন্ট খালি রয়েছে, এমন যাবতীয় জরুরি তথ্যের হদিস দিতেই একটি অ্যাপ ও পোর্টাল চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে ডব্লিউবিএসইডিসিএল (WBSEDCL) বা রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা। প্রাথমিক পরিকল্পনা ও রূপরেখা তৈরি। আপাতত সেই ডিজিটাল মঞ্চের নাম স্থির করা হয়েছে – ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইভি যাত্রা অ্যাপ’ (West Bengal EV Yatra App)।
দূষণ হ্রাস করতে ও তেল নির্ভর পরিবহণ জ্বালানির আমদানি খরচে রাশ টানতে বহু দিন ধরেই বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহারের উপরে জোর দিচ্ছে উন্নত দেশগুলির মতো ভারতও। দেশের গাড়ি বাজারের মধ্যে বৈদ্যুতিকের অংশীদারি (তিন চাকা বাদে) এখনও নামমাত্র। তবুও এমন গাড়ির চাহিদা বাড়ছে।
এ রাজ্যে অবশ্য সেই গতি তুলনায় কিছুটা কম। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অন্যান্য রাজ্যের মতো এখানে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে খুব বেশি ভর্তুকি মেলে না। উপরন্তু রাস্তায় চার্জ দেওয়ার পরিকাঠামো এখনও অপ্রতুল। তাই আগ্রহী হলেও অনেকেই এমন গাড়ি কেনার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রেখেছেন।
প্রসঙ্গত, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা ও সিইএসসি মিলিয়ে ১২৫০টির কিছু বেশি চার্জিং স্টেশন চালু রয়েছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি। আরও কিছু এই কেন্দ্র চালুর প্রক্রিয়া চলছে।

কুলপির পথসাথীতে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন।
বস্তুত, বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনা, নাকি পর্যাপ্ত সংখ্যক চার্জিং স্টেশন তৈরির জন্য অপেক্ষা করা, কোনটা আগে--এ নিয়ে বহু আগ্রহী ক্রেতা বিভ্রান্ত থাকেন। আবার চার্জিং স্টেশন যে একেবারে হচ্ছে না, এমন নয়। কিন্তু সেই তথ্যই ঠিকমতো আমজনতার মাঝে পৌঁছয় না। ফলে অনেকেই সাহসী হয়ে এক কদম আগাম এগোতে বারবার ভাবেন।
রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা সূত্রের দাবি, কেন্দ্রীয় সংস্থা ব্যুরো অফ এনার্জি এফিসিয়েন্সির (BEE) একটি অ্যাপ আগে ছিল। বেশ কিছু দিন ধরে সেটি কাজ না করায়, চার্জিং পরিকাঠামো সংক্রান্ত তথ্য পেতে সমস্যায় পড়েন গাড়িচালকেরা। সেই সূত্রেই অন্তত পশ্চিমবঙ্গের এই পরিকাঠামোর তথ্য সহজে তাঁদের হাতে পৌঁছে দিতেই ওই অ্যাপ ও পোর্টাল তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।
এটি তৈরির জন্য বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে প্রথমে আগ্রহপত্র (Expression of Interest বা EoI) ও পরে তার ভিত্তিতে দরপত্র (Tender) চাইবে সংস্থাটি। আগ্রহপত্র চাওয়ার বিষয়টি এ মাসেই হওয়ার কথা প্রথমে ভাবলেও আপাতত তার আগে এ ধরনের এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে একপ্রস্থ আলোচনা করে নিতে চাইছেন বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাটির কর্তারা। যারা বা যে সব সংস্থা ওই চার্জিং পরিকাঠামো তৈরি করে ব্যবসা করছে বা ব্যবসা করবে বলে বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাটির কাছে থেকে কাজের বরাত (work order) পেয়েছে, তাদের নিয়ে আগামী ২৯ জানুয়ারি বৈঠকে বসবেন বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাটির কর্তারা।
কারণ ওই সব সংস্থাকে চার্জিং স্টেশনের অবস্থান, সেগুলি চাল রয়েছে কিনা, চালু থাকলে সেখানকার কয়টি চার্জিং পয়েন্ট খালি রয়েছে, সেই সংক্রান্ত একেবারে প্রতি মুহূর্তের তথ্য (live data) ওই অ্যাপ বা পোর্টালে দিতে হবে। চার্জ দেওয়ার পরে অনলাইনে মাসুল মেটানোর ব্যবস্থাও ওই অ্যাপেই করা যায় কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে।
মোট কথা, সবটা একসঙ্গে জুড়তে (integrate) হবে। ফলে আগেই আগ্রহপত্র চাওয়ার আগে এই সব সংস্থার সঙ্গে গোটাটা নিয়ে একপ্রস্থ আলোচনা সেরে নিতে চাইছেন তাঁরা। তারপরের ধাপ হল সংশ্লিষ্ট আগ্রহপত্র চাওয়ার প্রক্রিয়া যেখানে মূলত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলিই অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাঝে নির্বাচনের জন্য কোনও নিয়মমাফিক বাধা না পড়লে, মাস তিনেকের মধ্যে অ্যাপটি চালু করতে চায় সংস্থাটি।
এ দিকে, সংশ্লষ্ট মহল সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় ভারী শিল্প মন্ত্রক (যাদের অধীনে পড়ে গাড়ি শিল্পমহল) বিইই-র পরে সারা দেশের জন্য নতুন একটি এ ধরনের অ্যাপ তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থা ভেল-কে দায়িত্ব দিয়েছে। সেটিও চালু হলে ভবিষ্যতে সেটির সঙ্গে রাজ্যের অ্যাপটি জুড়তে পারে।
একবার দেখে নেওয়া যাক, রাজ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির অগ্রগতি কী রকম :

উপরের সারণী থেকেই দেখা যাচ্ছে, এ রাজ্যেও সব ধরনের বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে বেড়েছে। লক্ষ্যণীয় ভাবে তিন চাকার গাড়ির বিক্রি বৃদ্ধির হার বিপুল। কারণ মূলত টোটো। তবে অ্যামাজ়ন, ফ্লিপকার্ট, ব্লিঙ্কিটের মতো ই-কমার্স সংস্থাগুলির হাত ধরে বাড়ি বাড়ি পণ্য পৌঁছনোর ব্যবসাও বৃদ্ধি পাওয়ায় টাটা মোটরস, অশোক লেল্যান্ডের মতো সংস্থার তিন চাকার বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রিও বাড়ছে। এ ছাড়া কৃষিকাজের জন্য ট্র্যাক্টরও বৈদ্যুতিক কেনার দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই।
সব মিলিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বাড়লে পথের ধারে চার্জিং পরিকাঠামোর আরও প্রয়োজন পড়বে। সেই সঙ্গে চার্জিং স্টেশনের অবস্থান-সহ অন্যান্য লাইভ তথ্যের প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে। গাড়ি শিল্পের একাংশের মতে, রাজ্য বিদ্যুত বণ্টন সংস্থাটির ওই অ্যাপ চালু হলে সুবিধা হবে বৈদ্যুতিন গাড়িচালকদের। চার্জ ফুরোলে মাঝপথে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কাও দূর করা সহজ হবে।