
শেষ আপডেট: 14 July 2023 02:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, গভীর রাত। সারা দেশে বিস্তর আন্দোলন ফেলে ইসরো থেকে লঞ্চ করা হয়েছিল চন্দ্রযান ২। তবে সেবারের এত প্রস্তুতি, এত পরিকল্পনা, এত দিনের এত পরিশ্রম-- সবই পরিণত হয়েছিল স্বপ্নভঙ্গে। সফল হয়নি উৎক্ষেপণ। ইসরো-র (ইন্ডিয়ান স্পেস অ্যান্ড রিসার্চ অর্গানাইজেশন) সঙ্গে সঙ্গে কার্যত গোটা দেশ কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সেদিনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, বিস্তর গবেষণা ও সংশোধনের পরে, আজ তিনটে বছর পরে আবার সুযোগ এসেছে দেশের মুখে 'চাঁদের হাসি' ফোটানোর। ১৪ জুলাই ২০২৩, লঞ্চ হতে চলেছে ইসরোর চন্দ্রযান ৩ (Chandrayaan 3)। সব ঠিক থাকলে আজ, শুক্রবারই দুপুর ২:৩৫ মিনিটে চাঁদের দিকে হুশ করে উড়ে যাবে সে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই ইসরো ঘোষণা করেছিল, দ্বিতীয় চন্দ্রযাত্রার ভুলগুলো শুধরে যাবে তৃতীয় মিশনে। পালকের মতো সফট ল্যান্ড করবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর আঁধার পিঠে, কোনও যান্ত্রিক গোলযোগ হবে না। ল্যান্ডার বিক্রমের দুঃখ ঘোচাবে চন্দ্রযান-৩। এবার সে ল্যান্ড করবে 'বাহুবলী'র পিঠে চেপে।

ইসরো সূত্রের খবর, সব প্রস্তুতি সারা হয়ে গেছে। এখন কাউন্টডাউন চলছে। চন্দ্রযানকে চাঁদে নিয়ে যাবে যে পেল্লায় রকেট সেই ‘বাহুবলী’ জিএসএলভি মার্ক-৩ (GSLV Mark 3) সেজেগুজে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ কেন্দ্রের লঞ্চিং স্টেশনে অপেক্ষা করছে। সবুজ সঙ্কেত পেলেই চন্দ্রযানকে নিয়ে হুশ করে উড়ে যাবে চাঁদের দেশে। সময় নির্ধারিত হয়েছে, শুক্রবার দুপুর ২:৩৫।
ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ইসরো’র তৈরি ‘জিও-সিনক্রোনাস স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল’ (জিএসএলভি)-মার্ক-৩ চাঁদের মাটিতে যাতে সফল ভাবে সফ্ট ল্যান্ডিং করতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে ইসরো সূত্রের খবর। ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ল্যান্ডার ‘বিক্রম’-কে চাঁদের পিঠে নামাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল ইসরোর চন্দ্রযান-২ মহাকাশযান। সেই অভিযানে পাঠানো অরবিটরটি এখনও চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। তাই এ বারের অভিযানে ইসরো আর কোনও অরবিটার পাঠাবে না চাঁদের কক্ষপথে। চাঁদের মাটিতে নামতে কক্ষপথে থাকা চন্দ্রযান-২ এর অরবিটারেরই সাহায্য নেবে এ বার চন্দ্রযান-৩ এর সঙ্গে যাওয়া ল্যান্ডার আর তার ভিতরে থাকা রোভার।

চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরেই ল্যান্ডার বিক্রমের সঙ্গে সবরকম যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। চাঁদের কক্ষপথে ঘুরতে থাকা অরবিটার রেডিও সিগন্যাল পাঠালেও তাতে ধরা দেয়নি ল্যান্ডার বিক্রম। অবতরণের প্রথম পর্যায় গতিবেগের ভারসাম্য বজায় ছিল, অর্থাৎ চন্দ্রপৃষ্ঠের ৩০ কিলোমিটার থেকে ৭.৪ কিলোমিটার দূরত্বে বিক্রমের গতিবেগ স্বাভাবিক ভাবেই ১,৬৮৩ মিটার/সেকেন্ড থেকে কমে যায় ১৪৬ মিটারে। সমস্যা তৈরি হয় দ্বিতীয় পর্যায়ে গিয়ে। চাঁদের মাটির খুব কাছাকাছি গিয়ে গতিবেগে গলদ হয়ে যায় বিক্রমের। যে নির্দিষ্ট মাত্রার বেগ তার সিস্টেমে আপডেট করা ছিল সেটা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে বিক্রম। যে জায়গায় তার ল্যান্ড করার কথা ছিল তার থেকে অন্তত ৫০০ মিটার দূরে ছিটকে পড়ে।

ইসরোর চেয়ারম্যান এস সোমনাথ জানিয়েছেন, আগেরবারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের অভিযানে কোনও ‘অরবিটার’ থাকছে না। সমগ্র মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের পর পৌঁছে যাবে চাঁদের কক্ষপথে। তারপর তার মূল অংশটি চাঁদের চারপাশে ঘুরপাক খাবে, আর ‘ল্যান্ডার’ অংশটি বিচ্ছিন্ন হয়ে নেমে আসবে চাঁদের মাটিতে। এই বিষয়ে জাপান ও ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির সঙ্গে সহযোগিতায় রয়েছেন ইসরোর ইঞ্জিনিয়াররা। অবতরণ ক্ষেত্রেও চমক থাকবে। ইসরো জানিয়েছে, চন্দ্রযান-৩ নেমে আসবে চাঁদের দক্ষিণ মেরু বা ‘লুনার সাউথ পোলে’। যা কার্যত নজিরবিহীন।
এবারের চন্দ্রযান-৩ (Chandrayaan3) মিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, ল্যান্ডারকে চাঁদের মাটিতে অবতরণ করাতেই হবে। এবার আর কোনও ভুল করা চলবে না। তাই ল্যান্ডারের মডেল বানানো ও তার সফট ল্যান্ডিং করানোর জন্য আরও জোরদার গবেষণা হয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অভিজ্ঞ গবেষক রয়েছেন এই সফট ল্যান্ডিংয়ের দায়িত্বে। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক অমিতাভ গুপ্ত ও ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের অধ্যাপক সায়ন চট্টোপাধ্যায় ল্যান্ডারের মডেল বানানোর কাজ করেছেন।
এবারের চন্দ্রযানে মোট ১৩টি ‘থ্রাস্টার’ রয়েছে, যা সফট ল্যান্ডিং করতে সাহায্য করবে। জ্বালানি সহ মহাকাশযানটির ওজন প্রায় আড়াই হাজার কেজি। জ্বালানিশূন্য অবস্থায় সেটির ওজন ৫০০ কিলোগ্রামে নেমে আসবে। তাতে থাকবে বিশেষ ক্যামেরা এবং অন্যান্য প্রযুক্তি। অবতরণস্থল থেকে যদি ল্যান্ডার সরেও যায় তাহলেও যাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় থাকে সেই প্রযুক্তিও দেওয়া হচ্ছে।

চেয়ারম্যান এস সোমনাথ বলেন, 'আমরা বিভিন্নরকম ত্রুটি খতিয়ে দেখেছি। সেনসরের ত্রুটি, ইঞ্জিনের গোলযোগ, অ্যালগোরিদমের গোলমাল, হিসাবে ভুল। তাই নির্দিষ্ট গতিতে অবতরণের ক্ষেত্রে যা যা ত্রুটি হতে পারে, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে। তাই বিভিন্ন ত্রুটির বিষয়গুলি হিসাব করে চন্দ্রযান ৩ প্রোগ্রামে যুক্ত করে দিয়েছে ইসরো।'
চাঁদের মাটি, আবহাওয়া ইত্যাদি নানা বিষয়ে তথ্য পাঠাবে। যা ভবিষ্যতে গবেষণায় নতুন দিক খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এখন ইসরোর অন্দরে শুধুই একটাই কথা, সফলভাবে অবতরণ করাতে হবে এই যানটিকে। সেই জন্য প্রস্তুতি তুঙ্গে। চন্দ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা, সূর্যালোকের সঙ্গে বিক্রিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন চরম পরিস্থিতির সঙ্গে যাতে যন্ত্রপাতি মানিয়ে নিতে পারে, তার জন্য দফায় দফায় মহড়া চালাচ্ছে ইসরো। সব ঠিক থাকলে জুলাই মাসেই পৃথিবী ছেড়ে চাঁদে পাড়ি দেবে চন্দ্রযান ৩।

সবমিলিয়ে, কাউন্টডাউন চলছে। স্নায়ুর চাপ ধরে রেখে অপেক্ষা করছে গোটা ইসরো, অপেক্ষা করছে গোটা দেশ। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন স্পেস রিসার্চ সেন্টার থেকে দুপুর ২টো বেজে ৩৫ মিনিটে জিএসএলভি মার্ক-৩ রকেটে চেপে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সীমা ছাড়িয়ে যাবে ইসরোর চন্দ্রযান। এই গোটা মিশনের জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ৬১৫ কোটি টাকা।
নাসার আগেই চাঁদে যাচ্ছে ভারত, চন্দ্রযান-৩ কবে উড়বে, নতুন কী কী প্রযুক্তি থাকছে