দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের বদলে সচেতন হওয়া বেশি দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) বার বার বলেছে সামান্য উপসর্গেই ‘টেস্ট’ বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন। তাতেই চটজলদি ধরা পড়বে সংক্রমণ। কারণ নতুন গবেষণা বলছে এই ভাইরাস মানুষের থেকে বাহিত হচ্ছে বাতাস বা ‘এয়ার ড্রপলেট’-এর মাধ্যমে। প্লাস্টিক, কাঠ বা যে কোনও সারফেসে এরা বেঁচে থাকতে পারে কয়েক ঘণ্টা। এমনও দেখা গেছে সারফেসের ধরনের উপর নির্ভর করে ভাইরাসের স্ট্রেন বেঁচে রয়েছে পাঁচ-ছয় দিন পর্যন্ত।
নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV)নামকরণ হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন করোনা (CoV)পরিবারের বিশেষ একটি গোষ্ঠীর সদস্য এই ভাইরাস বা প্রকৃতঅর্থে ভাইরাল স্ট্রেন (Viral Strain)। বিটাকরোনাভাইরাসের বিশেষ একটি স্ট্রেন সার্স-সিওভি-২ (SARS-COV-2)বর্তমানে গোটা বিশ্বের ত্রাস । বহুবার জিনের গঠন বদলে এই স্ট্রেন মহামারীর জায়গায় চলে গেছে। এই ভাইরাল স্ট্রেনের সংক্রমণে যে সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোম দেখা দিচ্ছে তাকেই বলে সিওভিডি-১৯ (COVD-19)। ভাইরোলজিস্টরা বলছেন, এই ভাইরাল স্ট্রেনের উৎস ও এর প্রতিষেধক এখনও অজানা। ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে। এর চরিত্র পুরোপুরি বোঝা না গেলেও কীভাবে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং কোথায় কোথায় এর ঘাপটি মেরে থাকার সম্ভাবনা বেশি সেই তথ্য সামনে এনেছেন গবেষকরা।
https://twitter.com/NEJM/status/1239948357985955840
কীভাবে ছড়াচ্ছে ভাইরাস?
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সেন্টর ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC), লস এঞ্জেলসের বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে তাদের নতুন গবেষণার রিপোর্ট পেশ করেছেন। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন (NEJM)বিজ্ঞান পত্রিকায় এই গবেষণার রিপোর্ট সামনে এনেছেন বিজ্ঞানীরা। বলা হয়েছে, সার্স-সিওভি-২ ভাইরাল স্ট্রেন ছড়াচ্ছে মানুষের থেকে মানুষে অর্থাৎ ‘হিউম্যান ট্রান্সমিশন’ হচ্ছে।
এখন এই ভাইরাস কীভাবে ছড়াচ্ছে সেটাই বড় প্রশ্ন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সব ভাইরাসেরই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বাহিত হওয়ার জন্য একটা আধার দরকার হয়। যাকে অবলম্বন করেই এরা ছড়িয়ে পড়তে পারে অথবা এক শরীর থেকে অন্য শরীরে বাসা বাঁধতে পারে। এই আধার হচ্ছে বাতাস, কাঠ, প্লাস্টিক বা এমনই কোনও অজৈব বস্তু। বাতাসে কয়েক ঘণ্টা বেঁচে থাকতে পারে এই ভাইরাল স্ট্রেন। কখনও একদিনের বেশিও বাঁচতে পারে। বায়ুকণা বা বাতাসের জলীয় বাষ্পকে আধার করে অর্থাৎ ‘এয়ার ড্রপলেট’-এর মাধ্যমে এদের ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। তাছাড়া প্লাস্টিক ও স্টেনলেস স্টিলের উপরে দুই থেকে তিন পর্যন্ত বেঁচেবর্তে থাকতে দেখা গেছে এই ভাইরাসদের। কাঠ বা ওই জাতীয় সারফেস হলে সেখানে ২৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকতে পারে ভাইরাল স্ট্রেন। এই সময়ের মধ্যে যদি সেইসব সারফেসের সংস্পর্শে কেই আসে বা স্পর্শ করে তাহলে তার মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থেকে যায়। তাই হু-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন বার বার স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে নেওয়াটা বিশেষ প্রয়োজন। মামুলি সর্দি-কাশি বা জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলেও ফেলে না রেখে দ্রুত টেস্ট করানো প্রয়োজন। কারণ দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই ভাইরাসের সংক্রমণে উপসর্গ প্রাথমিকভাবে বোঝা যাচ্ছে না। দেহরসের নমুণা পরীক্ষা করালেই সংক্রমণ সামনে আসছে।
আরও একটা মাধ্যম আছে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সেটা হল ‘রেসপিরেটারি ড্রপলেট’। এক্ষেত্রেও বাতাসে ভেসেই ছড়াচ্ছে ভাইরাস। হাঁচি, কাশি বা থুতু-লালার মাধ্যমে এক শরীর থেকে অন্য শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। শ্বাসের মাধ্যমে বাহিত হওয়া ভাইরাস অন্য শরীরের শ্বাসযন্ত্রকেই আগে টার্গেট করে। ফুসফুস আক্রান্ত হয় সবচেয়ে আগে। কাশি বা গলা ব্যথা হলেই তাই ল্যাবোরেটরি টেস্টের কথা বলছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আধিকারিকরা। কারণ কোষের মধ্যে সংক্রমণ বেশি ছড়িয়ে পড়লে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভাঙতে থাকে। বিকল হতে তাকে একাধিক অঙ্গ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)নোভেল করোনার সংক্রমণকে ‘প্যানডেমিক’ বা বিশ্বজোড়া মহামারী ঘোষণা করেছে। চিনে এখন ভাইরাস সংক্রামিত সাত লাখের বেশি, মৃত্যু হয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি। চিনের পরেই করোনা মহামারী ইতালি, ইরানে। ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল, ব্রিটেন, আমেরিকাতেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। ‘হু’-র রিপোর্ট বলছে বিশ্বে এখনও অবধি করোনা আক্রান্ত হয়ে মতের সংখ্যা প্রায় ৮০০০, সংক্রামিত দু’লক্ষের বেশি। করোনাভাইরাসের প্রথম ভ্যাকসিন মানুষের উপর প্রয়োগ করেছে আমেরিকা। এমআরএনএ-১২৭৩ (mRNA-1273) নামে ওই ভ্যাকসিনের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষে, দ্বিতীয় পর্যায়ে গবেষণা চলছে। ভাইরাসকে নির্মূল করার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা। জোরদার কাজ চলছে ইজরায়েল, চিন এমনকি ভারতেও।
তথ্যসূত্র: সেন্টর ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) ও নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন (NEJM)-এর অফিসিয়াল টুইটার হ্যান্ডেল।