তৃণমূল কংগ্রেস বারংবার অভিযোগ করে যে, বিজেপি বাংলা বিরোধী, বাঙালি সম্পর্কে কিছুই জানে না। কিন্তু ব্রিগেডের মঞ্চের রূপ দেখে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, ভোটের আগে তৃণমূল নির্মিত এই তত্ত্ব খণ্ডন করতে চাইছে বিজেপি। স্বয়ং মোদীই বার্তা দিতে চাইছেন - আমি তোমাদেরই লোক।

ব্রিগেডে নরেন্দ্র মোদীর সভামঞ্চ
শেষ আপডেট: 13 March 2026 22:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলার প্রথম সারির চ্যানেলে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly) একটি গেম-শো সঞ্চালনা করতেন। ঘরে ঘরে সেই শো ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। ওই প্রোগ্রামের একটি সেগমেন্টের অপশন হিসেবে থাকত 'বাংলা ও বাঙালি'। প্রতিযোগীদের মধ্যে যাঁরা মনে করতেন তিনি 'বাংলা' সম্পর্কে ভাল জানেন, মূলত তাঁরা সেই অপশনই বেছে নিতেন। রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের (West Bengal Assembly Elections 2026) আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি সেই শোয়ে যেতেন তাহলে হলফ করে বলা যায়, ওই অপশনটাই বেছে নিতেন। কারণ বাংলা-বাঙালির ভোট পেতে গেলে তাঁদের তো চিনতেই হবে।
শনিবার শহরে কার্যত বিজেপির মহাযজ্ঞ। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সভা করবেন নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi Rally At Brigade)। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার আগে এটাই বিজেপির শেষ সভা হতে চলেছে। তাই প্রস্তুতিতে কোনও খামতি রাখছে না বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব। আর মোদীর জন্য মঞ্চ বাঁধতে গিয়ে তাঁরাও যে বাংলা-বাঙালির বিশেষ খেয়াল রেখেছে তা বলাই বাহুল্য। কোচবিহারের রাজবাড়ি, বাঁকুড়ার টেরাকোটার ঘোড়া, উত্তরবঙ্গের জঙ্গল থেকে দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দির - বিজেপির ব্রিগেডের মঞ্চের কোণায় কোণায় বাঙালিয়ানার আধিপত্য। বাঙালি অস্মিতায় শান দিতে মঞ্চের ব্যাকগ্রাউন্ডেই রাখা হয়েছে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের কাটআউট।
তৃণমূল কংগ্রেস বারংবার অভিযোগ করে যে, বিজেপি বাংলা বিরোধী, বাঙালি সম্পর্কে কিছুই জানে না। কিন্তু ব্রিগেডের মঞ্চের রূপ দেখে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, ভোটের আগে তৃণমূল নির্মিত এই তত্ত্ব খণ্ডন করতে চাইছে বিজেপি। স্বয়ং মোদীই বার্তা দিতে চাইছেন - আমি তোমাদেরই লোক।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই পরিকল্পনার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একটি স্পষ্ট বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে অভিযোগ তোলা হয়েছে, বিজেপি নাকি বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন। সেই অভিযোগ নস্যাৎ করতেই এবার বিজেপি নিজেদের ভিন্নভাবে তুলে ধরতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজেপির সভায় সাধারণত ‘ভারত মাতা কী জয়’ কিংবা ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান শোনা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলায় সভা করতে এসে দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা ‘জয় মা কালী’ স্লোগান দিয়েছেন। কয়েক মাস আগে দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সংবর্ধনা সভাতেও মঞ্চে কালীমূর্তির ছবি রাখা হয়েছিল।
সম্প্রতি বাংলার মানুষের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠিও লিখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে তিনি বাংলার সংস্কৃতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং চিঠির শুরুতেই মা কালীর নাম উচ্চারণ করেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেই বার্তার ধারাবাহিকতাই এবার ব্রিগেডের মঞ্চে তুলে ধরতে চাইছে বিজেপি।
শুক্রবারই ব্রিগেডে সভাস্থল পরিদর্শনে গেছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। স্বাভাবিকভাবে তাঁদের কাছেও এই বাঙালিয়ানার প্রশ্ন ওঠে। সেই প্রসঙ্গে তাঁরা স্পষ্ট করে দেন, বাঙালি 'জয় মা কালী'ও বলবে, 'জয় শ্রীরাম'ও বলবে, বাঙালি আবেগ আলাদা করে ছোঁয়ার প্রয়োজন হয় না। পাশাপাশি এও দাবি করেন, এই ব্রিগেড রাজ্যে পরিবর্তনের সূচনার ব্রিগেড।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের কয়েকটি নির্বাচনে তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বাঙালি বিরোধী’ তকমা তুলে ধরে রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছিল। বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই বিষয়টি বেশ আলোচনায় আসে। তাই এবারের নির্বাচনে বিজেপি নিজেদের বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত দল হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
তবে এই কৌশল কতটা ফল দেবে, তার উত্তর এখনই মিলছে না। তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন পর্যন্ত। সেই দিনই বোঝা যাবে নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপির 'বাঙালিয়ানায়' মন গলে বাংলার মানুষের, নাকি তাঁরা ময়দানি ভাষায় গেরুয়া বাহিনীকে 'বাপি বাড়ি যা' করে দেন।