কেউ খাতা খুলে পুরনো তালিকায় নিজের নাম খুঁজছেন, কেউ আবার চিন্তায় ডুবে, “বাবার নাম ছিল তো ২০০২-এ?”

গ্রাফিক্স-দ্য ওয়াল।
শেষ আপডেট: 27 October 2025 15:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারের (Bihar) কায়দায় বাংলাতেও (West Bengal, politics, ) ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (SIR) পথে কমিশন। সোমবার বিকেলে সাংবাদিক বৈঠক থেকে কমিশন এ ব্যাপারে বড় ঘোষণা করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ১ নভেম্বর থেকেই এরাজ্যে এসআইআর চালু হতে পারে বলে অনুমান করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমন আবহে চায়ের দোকান থেকে ট্রেনের বগি, এমনকী অফিস কাছারি সর্বত্রই ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন, এসআইআর চালু হওয়া মানে বাড়ি বাড়ি ফর্ম আসবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকায় (Voter List) 'নাম থাকবে তো?'
নির্বাচন কমিশনের দাবি, এটি শুধুই নিয়মিত শুদ্ধিকরণ। কিন্তু রাজ্যের রাজনীতি হয়ে আমজনতার হেঁশেল পর্যন্ত এখন এই তিন অক্ষরই যেন নতুন আতঙ্কের প্রতীক- এস-আই-আর।
কী হচ্ছে আসলে?
কমিশনের ভাষায়, এটা “ভোটার তালিকার মহা-পরিষ্কার অভিযান।” যাঁরা বেঁচে আছেন, কিন্তু মৃত ভোটারের তালিকায় চলে গেছেন, তাঁদের নাম ফেরানো হবে। আবার যাঁরা আর এই দেশে থাকারই কথা নয়, তাঁদের নাম বাদ যাবে।
অনেকের মতে, বিষয়টি শুনতে যতটা সহজ, কিন্তু প্রশ্ন অনেক—কীভাবে বোঝা যাবে কে বৈধ, কে অবৈধ? কমিশন সূত্রের দাবি, ২০০২ সালের ভোটার তালিকা হবে এই যাচাইয়ের মূল চাবিকাঠি। যাঁদের নাম বা পরিবারের নাম সেই তালিকায় আছে, তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। বাকিদের ক্ষেত্রে লাগবে প্রমাণ, এক বা একাধিক সরকারি নথি।
লাগবে কোন কোন প্রমাণ?
কমিশনের ‘১১ নথি’র তালিকা ইতিমধ্যেই নির্ধারিত। জন্ম শংসাপত্র থেকে পাসপোর্ট, ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসের পুরোনো নথি, জমির দলিল, শিক্ষাগত প্রমাণপত্র— যেকোনও একটি। সঙ্গে আধার কার্ড দেখানো যাবে, তবে সেটা নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। আর ২০০২ সালের তালিকায় বাবার বা মায়ের নাম দেখাতে পারলে- প্রমাণ প্রায় নিশ্চিত।
বুথ লেভেল অফিসার (BLO) গিয়ে হাতে ধরিয়ে দেবেন এনুমারেশন ফর্ম। ফর্ম পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথি দিতে হবে। একটি ফর্ম থাকবে ভোটারের কাছে, অন্যটি যাবে কমিশনের কাছে।
কার নাম কাটা যেতে পারে?
কমিশন সূত্রে খবর, মৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়বে, অন্যত্র যাঁরা চলে গেছেন, তাঁদেরও নাম মুছে যাবে, আর যাঁরা নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারবেন না, তাঁদের নামও বাদ যাবে তালিকা থেকে।
কমিশনের এক উচ্চ পদস্থ আধিকারিকের কথায়, “কমপক্ষে এক কোটি নাম বাদ যেতে পারে।” এর মধ্যে মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত ভোটার, আর তথাকথিত ‘অবৈধ ভোটার’, তিনেই মিলে এই বিশাল সংখ্যা।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই প্রক্রিয়ায় কমিশন ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে ২০২৫ সালের তালিকা মেলাচ্ছে।
যাঁদের নাম দুই জায়গায়ই মিলবে, তাঁদের আলাদা নথি দিতে হবে না। এটাই কমিশনের ভাষায় 'ম্যাপিং', যা এখনও পর্যন্ত কেবল পশ্চিমবঙ্গেই চালু হচ্ছে।
যাঁরা এই SIR প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন না, তাঁদের নাম থাকবে না নতুন তালিকায়। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকাই হবে একমাত্র বৈধ তালিকা। অর্থাৎ, এসআইআরে অংশ না নিলে, ভোটাধিকারই হারাতে পারেন।
কোথায় দেখা যাবে পুরোনো তালিকা?
২০০২ সালের ভোটার তালিকা এখনই পাওয়া যাচ্ছে সিইও পশ্চিমবঙ্গের ওয়েবসাইটে। ভোটগ্রহণ কেন্দ্র ও বিধানসভা এলাকা অনুযায়ী নাম যাচাই করা যাবে। রাজনৈতিক দলগুলির বুথ এজেন্টরাও সাহায্য করতে পারবেন।
কমিশনের অবস্থান বনাম রাজনীতি
কমিশনের দাবি, “এটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ, কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই।” বিরোধীদের অভিযোগ, “এসআইআরের আড়ালে বিজেপির এনআরসি-র ছায়া।” তৃণমূলের মতে, এটি ‘ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ছক’,
আর বিজেপির দাবি, “এটি কেবল ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ, অন্য কিছু নয়।”
ইতিমধ্যে দিল্লিতে দ্বিতীয় দফার বৈঠক সেরেছে কমিশন। বাংলার মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, “সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ। বিএলও নিয়োগ নিয়ে সামান্য জটিলতা আছে।”
এখনও পর্যন্ত কমিশনের ইঙ্গিত থেকে ওয়াকিবহাল মহলের অনুমান, বাংলায় আগামী মাসেই শুরু হতে পারে এনুমারেশন ফর্ম বিতরণ। তারপর মাস কয়েক ধরে চলবে খসড়া তালিকা তৈরির কাজ, 'শেষ কথা' বলবে চূড়ান্ত তালিকা।
ভোট, ভয় আর ফর্ম
রাজনীতির বাইরে, সাধারণ মানুষের কাছেও এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, “আমার নাম থাকবে তো?” কেউ খাতা খুলে পুরনো তালিকায় নিজের নাম খুঁজছেন, কেউ আবার চিন্তায় ডুবে, “বাবার নাম ছিল তো ২০০২-এ?” ফলে বাংলার গলিঘুঁজির রাজনীতিতে আবার ফিরে এসেছে সেই চেনা গন্ধ, ভোটের আগে ভয়, আর ভয়ের ভিতরেই রাজনীতি।