বার্তা সংখ্যালঘুদেরও।

শমীক ভট্টাচার্য।
শেষ আপডেট: 3 July 2025 18:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বুধবার দুপুরেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি (Bengal BJP, new president) পদে আসছেন শমীক ভট্টাচার্য (Shamik Bhattacharya)। আর বৃহস্পতিবার কলকাতার সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর মাথায় তুলে দেওয়া হল বঙ্গ বিজেপির কাণ্ডারির মুকুট।
নতুন সভাপতিকে স্বাগত জানান সদ্য প্রাক্তন সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা সুনীল বনশল, রবিশঙ্কর, মঙ্গল পাণ্ডে, অমিত মালব্য-সহ একাধিক নেতাও। তবে রাজনৈতিক মহলের নজর কাড়ে বঙ্গ বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের অনুপস্থিতি। দলের এই বড়সড় পরিবর্তনের দিনে তিনি থাকলেন না অনুষ্ঠানে।
দায়িত্ব নিয়ে প্রথম বার্তাতেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি শমীকের। বলেন, ‘‘একদিন বাংলায় বিজেপি অপাঙক্তেয় ছিল, আমাদের ভোট ১ শতাংশের নীচে ছিল। আর আজ বাংলার মানুষ তৃণমূলকে হঠিয়ে বাংলায় বিজেপির সরকার গঠনের জন্য তৈরি হচ্ছেন। এবারে আর দু'শ পার নয়, তৃণমূলের পরপার নিশ্চিত।"
শমীক এও বলেন, "মমতার বিকল্প মুখ কোথায়? বাংলার মানুষ স্থির করে নিয়েছেন, ছাব্বিশের ভোটে তৃণমূলকে তাঁরা বিদায় দেবেন, কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সততার প্রতীক আর কাজে লাগছে না। দুর্নীতির সরকারকে হঠাতে মানুষ বদ্ধ পরিকর।”
বিজেপি মানেই সংখ্যালঘু বিরোধী, বাংলার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচলিত এই অপবাদও ঘোচাতে চেয়েছেন শমীক। তাঁর কথায়, "আমরা সংখ্যালঘু বিরোধী নই, কারণ, বাংলায় সংখ্যালঘুরাও আক্রান্ত। আমরা চাই উল্টোরথ এবং মহরমের শোভাযাত্রা একসঙ্গে হোক।"
সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে শমীক এও বলেন, মুসলমান মানেই কি সমাজবিরোধী? যারা আমাদের অচ্ছুত মনে করেন, তাঁদের বলব, আমাদের ভোট দিতে না চাইলে নাই দেবেন, কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ান। দেখতে পাবেন, বাংলায় সব চেয়ে বেশি খুন হয়েছে মুসলমানরাই। কাদের জন্য এটা হল? তাঁদের বিদায় জানাবেন না?"
বাম, কংগ্রেস, এসইউসি-সহ রাজ্যের অন্যান্য বিরোধীদলের উদ্দেশেও বার্তা দিয়েছেন বঙ্গ বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি। শমীকের কথায়, "নো ভোট টু বিজেপির আড়ালে চক্রান্ত তৈরি করে ভোট কাটার রাস্তায় গিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে তৃণমূলকে ফিরিয়ে আনবেন না। অনুরোধ করব, নিজেদের পতাকা কিছুদিনের জন্য দূরে সরিয়ে রেখে পথে নামুন, ২৬ এ তৃণমূলকে বিসর্জন দিন।"
রাজ্য সভাপতি পদে বসার সঙ্গে সঙ্গে দলের নতুন পুরনো দ্বন্দ্বও মেটাতে চেয়েছেন শমীক। তাঁর কথায়, "কে নতুন কে পুরনো প্রাসঙ্গিক নয়, কে কমিটিতে রইলেন কে কমিটিতে রইলেন না প্রাসঙ্গিক নয়, কোনও বিজেপি নেতা তাঁর পাড়ায় তাঁর বুথে প্রাসঙ্গিক কিনা সেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।"
কর্মীদের ভরসা দিতে শমীক এও বলেন, "এগারো সালে সিপিএমের ব্রিগেড দেখে কেউ ভাবতে পেরেছিলেন, এই দলটা হারছে! ফলে এখন থেকেই তৈরি হন, ছাব্বিশে তৃণমূলকে বিসর্জন দেওয়ার জন্য।" এও বলেন, "তৃণমূলের একতরফা লড়াই আর চলবে না। প্রয়োজনে লড়াই হবে, ওদেরকে বিসর্জন জানানোর জন্য সেই লড়াই লড়তে হবে কর্মীদের।"
ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়ার ডাক দিয়ে দলের কর্মীদের উদ্দেশে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "কপালের ওপরে নয়, সোশ্যাল মিডিয়ার ওপরে নয়, নিজেদের কর্মের ওপরে জোর দিতে হবে,. প্রতি বুথে ৩০ জন যোদ্ধা তৈরি করে তৃণমূলকে হঠাতে হবে. এটাই হোক, শমীক ভট্টাচার্যকে আমাদের সংবর্ধনা।"
২০২১ সালে সভাপতি হয়েছিলেন সুকান্ত মজুমদার। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ছয় বছর এই পদে থাকতে পারেন। তাছাড়া বর্তমানে সুকান্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী সভাপতির পদে থাকা সম্ভব নয়। ফলে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু শমীকই কেন? এই প্রশ্নে রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, বিজেপির ‘পুরনো’ এবং ‘নব্য’ দুই ধারার নেতাদের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রয়েছে তাঁর। বাগ্মী, অভিজ্ঞ এবং দলের দীর্ঘদিনের মুখ—এই গুণাবলিই তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে। এক সময় রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র হিসেবে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন, এখন রাজ্যসভায় দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
১৯৭৪ সালে হাওড়ার মন্দিরতলায় আরএসএসের শাখায় যাতায়াত দিয়ে শুরু তাঁর সঙ্ঘ-পরিবারের পথচলা। ২০০৬ সালে শ্যামপুকুর থেকে বিজেপির টিকিটে লড়লেও জয় পাননি। তথাগত রায়ের আমলে দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে দিলীপ ঘোষ সভাপতি হলে মুখপাত্র হন, কিন্তু তখনও ‘প্রকৃত গুরুত্ব’ পাননি—এই অভিযোগ দলের অন্দরেই ছিল দীর্ঘদিন।
অবশেষে বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদে বসে নতুন অধ্যায় শুরু করলেন শমীক ভট্টাচার্য। ছাব্বিশের ভোটের আগে তিনি কতটা সংগঠন গুছিয়ে উঠতে পারেন, নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।