
শেষ আপডেট: 12 November 2023 13:35
কলকাতার আদি বারোয়ারী কালীপুজোগুলির মধ্যে অন্যতম হল মধ্য কলকাতার ফাটাকেষ্টর কালী পুজো। ফাটাকেষ্টর জমানা এখন নেই বটে, কিন্তু এখনও এগিয়ে চলেছে সেই কালীপুজো। সাতের দশকের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ফাটাকেষ্ট আজ 'মিথ'। কালীর উপাসক ছিলেন ফাটাকেষ্ট। কে না এসেছে কলকাতার ‘সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট’-এর 'নব যুবক সংঘ' আয়োজিত ফাটাকেষ্টর কালীপুজোতে! উত্তমকুমার, শত্রুঘ্ন সিনহা, দেব আনন্দ থেকে অমিতাভ বচ্চন, রাজেশ খান্না, মিঠুন চক্রবর্তী। কালীপদ পাল প্রথম থেকেই ‘ফাটাকেষ্ট’-র কালী প্রতিমা নির্মাণ করতেন। বর্তমানে তাঁর ছেলে মাধব পাল এই প্রতিমার ভাস্কর। মধ্য কলকাতার কালীপুজো বললেই এই পুজোর নাম আসবে।
মধ্য কলকাতার পুজো হওয়ায় দক্ষিণ কলকাতা, বেহালা বা বন্দর এলাকার লোকেদের এই ফাটাকেষ্টর ঠাকুর দেখতে চিরকালই যেতে হয় সেই সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে। তবে এবার খোদ বেহালাতে আবিভূর্তা হলেন ফাটাকেষ্টর কালী। বেহালা বক্সিবাগান অঞ্চলের সরকার বাড়িতে আরাধনা করা হচ্ছে এই নীলমূর্তি শ্যামাকালীর। এই প্রতিমারও ভাস্কর মাধব পাল, যিনি তৈরি করেন ফাটাকেষ্টর কালী। অবিকল ফাটাকেষ্টর প্রতিমার আদলেই মাধব পাল নির্মাণ করেছেন বেহালা সরকার বাড়ির কালীমূর্তি। যেন ফাটাকেষ্টরই ঠাকুরের ছোট সংস্করণ! তবে খুব ছোট নয়। সরকার বাড়ির সেই প্রতিমা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাবে।
ফাটাকেষ্ট একসময় ছিলেন কলকাতার ত্রাস। তাঁর পুজো হল সর্বজনীন। যুগ বদলেছে। সেই প্রতিমাকেই বাড়ির পুজোয় আরাধনা করা এক বৈপ্লবিক ঘটনা তো বটেই। বেহালা সরকার বাড়িতে এই কালীপুজোর সূচনা করেন তাপস সরকার। তাঁর প্রয়াণের পর পুজোর দায়িত্ব একার কাঁধে তুলে নিয়েছেন তাপসবাবুর একমাত্র পুত্র অভিষেক সরকার। সঙ্গে আছেন তাপসবাবুর স্ত্রী অনিমা সরকার। মা ও ছেলের যৌথ প্রয়াসেই এই পুজোর আয়োজন। একদিকে যেখানে মধ্য কলকাতার বহু লোকের প্রচেষ্টায় নব যুবক সংঘে ফাটাকেষ্টর পুজো হচ্ছে, ঠিক সেই প্রতিমার আদলেই কালী আরাধনার নিঁখুত আয়োজন করে ফেলেছে এক মা ও তাঁর ছেলে। চমকপ্রদ ব্যাপার বইকি!
অভিষেক জনিয়েছেন, তাঁদের বাড়িতে প্রতি বছর দুর্গা পুজো,অন্নপূর্ণা পুজো ও কালী পুজো সাড়ম্বরে পালিত হয়। সঙ্গে লক্ষ্মী সরস্বতী মনসা পুজো তো আছেই। "ফাটাকেষ্টর ঠাকুর দেখতে বাবার হাত ধরে ছোটবেলায় যেতাম, পরে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছি। মনে সুপ্ত ইচ্ছে ছিল কালীপুজো করলে এমন ঠাকুরই বাড়িতে আনব। দক্ষিণা কালী আলাদা হয়। আর আমাদের বাড়িতে হয় শ্যামা কালীর পুজো। খোঁজাখুঁজি করতে করতেই ফাটাকেষ্টর কালীর কারিগর মাধব পালবাবুর সঙ্গে আলাপ হল। কালীপদ পালের ছেলে মাধব পাল। এখন মাধব পালের মেয়ে মিলি পালও তাঁকে সহযোগিতা করেন। মাধব পাল মহাশয় ওই একই আদলের ছোট মূর্তি বানিয়ে দিতে সম্মত হলেন। এমনকী, নবযুবক সংঘ ফাটাকেষ্টর পুজোর উদ্যোক্তারাও আমাদের বাড়ির পুজোতে এসেছেন। পুজোর প্রশংসা করে গেছেন। বেহালাতে একমাত্র আমাদের সরকার বাড়িতেই ফাটাকেষ্টর প্রতিমার আদলে পুজো হয়। দক্ষিণ কলকাতার কোথাও এই একই মূর্তির দেখা মেলে না। আমিই প্রথম বেহালাতে শুরু করি এই মূর্তির পুজো," জানিয়েছেন অভিষেক।
এই কালী প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল গায়ের রং গাঢ় নীল। সচরাচর দেখা শ্যামা কালীর থেকে আলাদা। গলার মুণ্ডমালা ছাড়াও প্রতিমার গায়ের ধার ঘেঁষে আরও মুণ্ডমালা আছে। অসুর বধ করার সময় মুণ্ডমালা শোভিতা মায়ের রূপ ফুটে উঠেছে এই মূর্তিতে। কিন্তু মায়ের মুখ উগ্রচণ্ডা নয়, বরং মাতৃস্নেহে স্নিগ্ধ। আরও একটা বৈশিষ্ট্য হল, শিবের সাপ মুখ উঠিয়ে কালীর হাতে ধরা মুণ্ড থেকে রক্ত খাচ্ছে। এটা আর কোনও কালী মূর্তিতেই দেখা যায় না। মাধব পালের একদম নিজ্বস্ব স্টাইল এটা।
ফাটাকেষ্টর পুজোর মূর্তির সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও সরকার বাড়ির কালী পুজোর কিছু নিজস্ব নিয়ম আছে। মায়ের নাম এখানে আনন্দময়ী।
অভিষেক জানিয়েছেন, "আমরা আনন্দময়ী মায়ের ভক্ত। সেখান থেকেই আমাদের মা কালীর নাম রাখা হয়েছে শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালীমাতা ঠাকুরাণী। দেবীর নাকের টানা নাকছাবি সোনার। সোনার মুকুটও পরানো হয় পুজোর দিন। সাথে থাকে নানা অলঙ্কার।
আমাদের সরকার বাড়ির কালীপুজোয় সুরার ব্যবহার নেই এবং কোনও বলি হয়না। কালীপুজোর দিন আগে দীপান্বিতা লক্ষ্মী ঠাকুরের পুজো হয়। তারপর কালীপুজো শুরু হয়। সেই কারণেই আমাদের মা কালীর ভোগ সব নিরামিষ। আমাদের দুর্গাপুজো আবার বিপরীত নিয়মে হয়, সেখানে বলি আছে, মা দুর্গাকে মাছ ভোগ নিবেদন করা হয়। মা কালীর সঙ্গে লক্ষ্মী থাকেন বলেই নিরামিষ ভোগ। তাতে লুচি, খিচুড়ি, সাত রকমের ভাজা, কচুরি, খিচুড়ি, নাড়ুর সম্ভার, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি। সরকার বাড়ির পুজোর আরও একটা ব্যাপার, কালীপুজো এক আসনে করেই ঘট নিরঞ্জন করা হয়। মা কালী সূর্যের আলো দেখেন না। পরের দিন দধিকর্মা হয় না। প্রতিমা থাকেন, পরদিন বিসর্জন দেওয়া হয়। কিন্তু কালী পুজোর দিন রাতেই পুজো শুরু হয় এবং পুজো শেষ করে ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়।"
পুজো আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সরকার বাড়ির লাল মেঝেতে নিখুঁত সাদা আলপনায়। তুলি দিয়ে নয়, নিজের হাত দিয়েই এই মনোগ্রাহী আলপনা এঁকেছেন অভিষেক সরকার। প্রতিমা ছাড়াও বিশেষ ভাবে চোখ টানে এমন সুন্দর আলপনা।
কীভাবে সরকার বাড়ির প্রতিমা দর্শন করতে আসবেন? তার জন্য বাস কিংবা অটোয় বেহালা ট্রামডিপোতে নেমে সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের বিপরীত গলি দিয়ে ব্রাহ্মসমাজ রোড ধরে সোজা চলে আসতে হবে বক্সিবাগান। সেখানকার বাসিন্দাদের যে কাউকে বললেই দেখিয়ে দেবে বিখ্যাত সরকার বাড়ি। মধ্য কলকাতার ফাটাকেষ্টর কালী পুজো দেখতে যেতে পারছেন না অনেক দূর বলে? তাঁর অবিকল অনুকৃতি বেহালাতেই দেখে সাধ মেটান। বরং বারোয়ারির জাঁকজমকের থেকেও বাড়ির পুজোতে পাবেন আন্তরিকতা, ঘরোয়া পুজোর আমেজ।