দ্য ওয়াল ব্যুরো: টানটান টেনশন। প্রতিটি মিনিটে ঠাসা রোমাঞ্চ। সব মিলিয়ে যাত্রা শুরু থেকে লখিমপুর (lakhimpur)পৌঁছনো—১৪ ঘণ্টার মামলা। নেপাল সীমান্ত লাগোয়া লখিমপুরে নিহত কৃষকদের গ্রামে তৃণমূল সাংসদদের পৌঁছনো যেন গেরিলা অপারেশন (guerilla operation)। মহালয়ার বিকেলে নজরুল মঞ্চে জাগোবাংলার উৎসব সংখ্যা প্রকাশ অনুষ্ঠানে যার কিছুটা ইঙ্গিত দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (mamata banerjee)। বললেন, “ওখানে আর কেউ পৌঁছতে পারেনি। শুধু তৃণমূলের টিমই (tmc team) পৌঁছতে পেরেছে। লুকিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের লোকেরা ওখানে গিয়েছিল। আমি তো শুনলাম দোলা (সেন) পাঞ্জাবি সেজেছিল!”
তৃণমূলনেত্রী দু’লাইনে বলেছিলেন। কিন্তু তা শুনলে কৌতূহল জাগতে বাধ্য। যেখানে প্রিয়ঙ্কা গান্ধীদের পুলিশ আটকে দিল, রাস্তার মাঝে বসে পড়তে হল সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবকে, সেখানে তৃণমূল লখিমপুরে গ্রামে পৌঁছল কী করে?
দ্য ওয়ালের তরফে যোগাযোগ করা হয়েছিল রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেনের সঙ্গে। তৃণমূল সাংসদ বলেন, নেত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন ওখানে পৌঁছতে হবে। আমরাও মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম, যেনতেনপ্রকারেণ পৌঁছতেই হবে। তার জন্য আমরা শুধু কৌশল করেছি। বারবার কৌশল বদলেছি। ৮ ঘণ্টার রাস্তা পৌঁছতে সময় লেগেছিল ১৪ ঘণ্টা। এই রাস্তায় কখনও দোলা সেন সেজেছেন পাঞ্জাবি, আবার কখনও পরিচয় দিয়েছেন পর্যটক।
কেমন ছিল পুরো জার্নিটা?
তৃণমূলের পাঁচ সাংসদকে লখিমপুর যাওয়ার নির্দেশ দেয় দল। তাঁরা কারা? দোলা সেন ছাড়াও সেই তালিকায় ছিলেন আবিররঞ্জন বিশ্বাস, প্রতিমা মণ্ডল, সুস্মিতা দেব এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদার। এই পাঁচ জনকে দুটি ভাগে ভেঙে নেন দোলারা। কাকলি আর সুস্মিতা লখনউয়ের বিমান ধরেন। লখনউ বিমানবন্দর থেকে মাথায় ঘোমটা টেনে রওনা দেন লখিমপুরের হাসপাতালের দিকে। তাঁরাও বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে পৌঁছে যান হাসপাতালে। জখম কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন।
দোলারা দিল্লিগামী বিমান ধরেন কলকাতা থেকে। দিল্লি বিমানবন্দরে নেমেই একটি হলুদ নম্বর প্লেটের গাড়ি ভাড়া নেন তাঁরা। দোলা ছাড়া সেই দলে আবিররঞ্জন আর প্রতিমা। যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে এড়িয়ে অন্য রাস্তা ধরে তাঁদের ট্যাক্সি। দোলা বলেন, চালক ছিলেন পাঞ্জাবি। মাথায় পাগরি ছিল তাঁর। বারবার গাড়ি আটকাচ্ছিল পুলিশ। যত জায়গায় আমাদের আটকায়, আমরা বলি ট্যুরিস্ট। কখনও বলি নৈনিতাল যাব। কখনও বলি বরেলি। এই করতে করতে এগোতে থাকে আমাদের গাড়ি। তবে সাথ দিয়েছিল গাড়ির হলুদ নম্বর প্লেট!”
রাতে লখিমপুর পৌঁছন দোলারা। তখন রাত সাড়ে দশটা। তৃণমূল সাংসদ বলেন, সারা ভারত কিষান সংঘর্ষ মোর্চার নেতা রাকেশ টিকায়েতদের সংগঠনের লোকজন তাঁদের ব্যাপক সাহায্য করে। ওই রাতে একটি সাধারণ গেস্ট হাউসে ওঠেন দোলা, আবির, প্রতিমা। টিকায়েতের লোকজনই সেই ব্যবস্থা করে দেন। স্বচিত্র পরিচয়পত্র হিসেবে গেস্টহাউসে এমপি কার্ডের বদলে সাধারণ ভোটার পরিচয়পত্র জমা রাখেন তিন সাংসদ। দোলা এও বলেন, ওই যে সকাল ছটায় কলকাতা থেকে প্লেনে উঠেছিলেন তারপর রাত ১২টা পর্যন্ত একটা দানাও মুখে কাটেননি। শুধু জল খেয়ে কাটিয়েছেন। কারণ মাথায় একটাই কথা—দিদির নির্দেশ। পৌঁছতেই হবে লখিমপুরে।
রাতে সামান্য রুটি তরকারি। তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম। তারপর ফের অপারেশন। এবার পরের দিন সকালে কাক ডাকার আগেই গেস্টহাউস ছেড়ে বেরিয়ে যান দোলারা। তিনি বলেন, আমাদের একটাই উদ্দেশ ছিল, পুলিশের ঘুম ভাঙার আগে রওনা দেওয়া।
এরপর পরের দিন সকালের সফরটা আরও টানটান। গাড়ির চালক শিখ। তাই দোলা এমন ভাবে সালোয়ার-কামিজ পরে দোপাট্টা নিয়েছিলেন যাতে মনে হয় তিনিও পাঞ্জাবি। রিস্তেদার হিসেবে যাচ্ছেন আত্মীয়ের বাড়ি। প্রতিমাকেও পরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর সালোয়ার কামিজ। যাতে প্রতিমা আর আবিরকে পৃথক যুগল মনে করে পুলিশ।
এভাবেই একের পর এক হার্ডল টপকে লখিমপুরে যায় তৃণমূলের তিন সাংসদের দল। বেশ কয়েকটি গ্রাম, নিহতের বাড়ি ঘুরে ফেলার পর টনক নড়ে পুলিশের। কিন্তু ততক্ষণে মিশন লখিমপুর সফল করে ফেলেছেন দোলারা।
ছক সাজানোই ছিল। দোলারা যখন লখিমপুরের গ্রাম ছাড়ছেন তখন লখিমপুর হাসপাতালে জখম কৃষকদের দেখতে ঢুকছেন কাকলি, সুস্মিতা। মাথায় ঘোমটা টেনে।