বেলুড়ে এসে ছোট্ট একটা দোকান করেন অন্নপূর্ণা। মরশুমে যখন যা কিছুর চাহিদা, সে সবই বিক্রি করতে শুরু করেন। দোলের সময় আবির, সরস্বতী পুজোর সময় প্রতিমা, এভাবেই একবার কালীপুজোয় বাজি (Burimar Baji) বিক্রি করতে শুরু করেন।

শেষ আপডেট: 18 October 2025 14:45
দেশভাগ। নিমেষে যেন ছিন্নভিন্ন মাধ্য়াকর্ষণের টান। ভিটেমাটি ছেড়ে ছিন্নমূল মানুষ। কোথায় যাবেন-কী খাবেন, ছিঁড়ে যাচ্ছে চিন্তাসূত্রের জাল। পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গমুখী দিশেহারা মানুষের ঢল। আরও অনেকের সঙ্গে সেই ভিড়ে মিশে গিয়েছিলেন অন্নপূর্ণা দাস। দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রথমে দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে। রিফিউজি ক্যাম্পের অনিশ্চয়তায় লেখা চলছিল দিনলিপি।
কিন্তু এভাবে তো বেশিদিন চলবে না। ক্য়াম্পের বাইরে বেড়িয়ে জীবনের খোঁজ শুরু করেন অন্নপূর্ণা (Annapurna)। নিজেকে বাঁচাতে হবে। বাঁচাতে হবে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা পরিবারকে। আরও কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে চলে আসেন মধ্যমগ্রামে। রুটিরুজির খোঁজ চলতে থাকে। কিন্তু সুবিধা হয়নি তেমন। এরপরের গন্তব্য হাওড়ার বেলুড় (Belur)।
বেলুড়ে এসে ছোট্ট একটা দোকান করেন অন্নপূর্ণা। মরশুমে যখন যা কিছুর চাহিদা, সে সবই বিক্রি করতে শুরু করেন। দোলের সময় আবির, সরস্বতী পুজোর সময় প্রতিমা, এভাবেই একবার কালীপুজোয় বাজি (Firecrackers) বিক্রি করতে শুরু করেন। বাজির মুনাফা অন্য কিছুতে হয়নি। তাই এই ব্যবসাটা মনে ধরে। একসময় মনে হয় নিজেই যদি বাজি তৈরি করে বিক্রি করতে পারতেন, তবে হয়তো আরও বাড়াতে পারতেন লাভের অঙ্ক। ব্যাস, যেমন ভাবনা, তেমনই কাজ।
মানুষের পছন্দ মাথায় রেখে তৈরি করতে শুরু করেন নানা ধরনের পটকা। কোনওটার নাম আমড়া আঁটি তো কোনওটার নাম চকোলেট। সেই একেকটা বাজির পলতেতে আগুন ঠেকালেই কেঁপে উঠত চারপাশ। বাজির নাম বুড়িমা (Burimar Baji)। এই নামেই মানুষ চিনতে শুরু করেন তাঁকে। ধীরে ধীরে বুড়িমায় মিশে যান অন্নপূর্ণা।
এখন বুড়িমার চতুর্থ প্রজন্ম বাজির ব্যবসা সামলাচ্ছেন। বর্তমান মালিকদের অন্যতম সুনীত দাস জানান, বুড়িমার চকলেট বোম (Burimar Chocolate Bomb) আজও বাঙালির আবেগ, যদিও এখন শব্দ নয়, আলোতেই ফোকাস করছেন তাঁরা। তিনি বলেন, “আগে শব্দ ৯০ ডেসিবেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে অনেক বাজি তৈরি করা যেত না। এখন সেই সীমা কিছুটা শিথিল হওয়ায় আকাশ আলো হবে এমন বাজির দিকে আমরা মন দিচ্ছি। বুড়িমার নাম চকলেট বোমের জন্য বিখ্যাত, কিন্তু আজকের প্রজন্মের চাহিদা বদলেছে, তাই আমরাও সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছি।”
সময়ের দাবিতে বদলেছে মানুষের পছন্দ। এরসঙ্গে তাল রেখে এবার বেশ কিছু নতুন বাজি বাজারে আনছেন তাঁরা। এর বেশিটাই আতশবাজি। তিনি বলেন, "এবার আলোর বাজিতেই জোর দিচ্ছি। সরকারি নিয়ম মেনে ১২৫ ডেসিবেলের মধ্যে শব্দ, এমন বাজি তৈরি করেছি, যা আকাশে গিয়ে ফাটে। এবার বাচ্চাদের জন্য অনেক নতুন আইটেম এনেছি যেমন ড্রোন, হেলিকপ্টার, অর্জুন ট্যাঙ্ক, ট্রয়গান ইত্যাদি।”
কালীপুজোর সপ্তাহখানেক আগে থেকেই ভিড় বাড়ছে বেলুড়ে বুড়িমার দোকানে। হাওড়া তো বটেই লাগোয়া জেলাগুলি থেকেও মানুষ এসে লাইন দিচ্ছেন বাজি কেনার জন্য। ক্রেতাদের একটাই কথা, "এখান থেকে বাজি কিনলে একটাই লাভ, ফাটবে কিনা সেই চিন্তা করতে হয় না।" এত বছর পরেও বুড়িমার উপর মানুষের এই ভরসাতেই এগিয়ে রেখেছে অন্নপূর্ণার উত্তরসূরীদের।