তুর্কমেনিস্তান থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন এপ্রিল মাসে। গত ছ'মাসে আফ্রিকা ও ইউরোপের একাধিক দেশ পেরিয়ে ক্রমাগত এগিয়েছেন পূর্বদিকে।

শেষ আপডেট: 13 September 2025 19:48
তারপদ রায়ের কালীদা এই জীবন দেখেননি। কবিতায় তিনি যে ছবি এঁকেছিলেন, তাতে শুধু ধরা পড়েছিল প্রান্তিক বাঙালি জীবনের রোজকারের লড়াই। কিন্তু সে যেমন সত্য। তেমনই এও তো সত্য যে বাঙালিই পেরেছে বারবার ছক ভেঙে বেরিয়ে আসতে। চাঁদের পাহাড়ের শঙ্কর যেমন বেরিয়ে পড়েছিলেন একদিন।
খুঁজে পেতে এমনই আরও দুই বাঙালিকে পাওয়া গেল। বলা ভাল, বাঙালি দম্পতি। অতীতে যেমন মার্কো পোলোর বাবা ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সিল্করুটের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। তেমনই রেশমপথের সন্ধানেই বেড়িয়ে পড়েছেন সুপ্রতিম আর ঈপ্সিতা। তাঁদের বাহন একটি টয়োটা টান্ড্রায়। তাঁদের আদরের শাহজাদী। তুর্কমেনিস্তান থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন এপ্রিল মাসে। গত ছ'মাসে আফ্রিকা ও ইউরোপের একাধিক দেশ পেরিয়ে ক্রমাগত এগিয়েছেন পূর্বদিকে। এখন তাঁরা তীব্বতের নয়ালামে। নেপাল হয়ে পুজোর আগেই স্বভূমে ফিরছেন এই বাঙালি দম্পতি।
যাদবপুরের কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র ছিলেন সুপ্রতিম সান্যাল। স্ত্রী ঈপ্সিতা ছিলেন পুণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্টের ছাত্রী। দুজনের কর্মজীবন কেটেছে আমেরিকায়। স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন এবং ইনটেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলেন সুপ্রতিম। ঈপ্সিতা ছিলেন ফিনান্স সেক্টরে। চুটিয়ে চাকরি আর সংসার করেছেন জীবনের একটা বড় সময়। ছেলেমেয়েদের বড় করেছেন। অবসরে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
কিন্তু ৫০ পেরোতেই জীবনের অভিমুখটাকেই বদলে ফেললেন দুজনে। সিনিয়র সিটিজেন হওয়ার আগেই কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে ফেললেন ৫৫ বছরের সুপ্রতিম আর ৫১ বছরের ঈপ্সিতা। ওয়াশিংটন ডিসির সংসার তুলে সওয়ার হলেন টয়োটা টান্ড্রায়। ছেলেমেয়ে দুজনেই এখন প্রতিষ্ঠিত। কাজেই তাঁদের যে এখন বন্ধনহীন গ্রন্থি। আর ফিরে তাকাবেন কেন!
হাতছানি দিল সিল্করুট। কর্তা-গিন্নি দুজনেরই মনের বাসনা ছিল ইতিহাসের সিল্করুটের উপর নতুন করে আলো ফেলার। সেই সিল্করুট, যা একসময় ছিল বিশাল ঐতিহাসিক বাণিজ্য পথ। সেই সিল্করুট, যা একসময় ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পণ্য, সংস্কৃতি এবং চিন্তা চেতনা আদান-প্রদানের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই পথে চিন থেকে রেশম,পশম, সোনা ও রুপো ইউরোপের দিকে যেত এবং অন্যান্য পণ্য আসতো পূর্বদিকে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ দৃঢ় করেছিল সিল্করুট।
ভারতীয়দের জন্য এই রেশম পথ উন্মুক্ত হয়েছিল কুষাণ বংশের শাসক কনিষ্কর সময়ে। সে সময় চিনের হান রাজবংশের রাজত্বকাল। এই রেশম পথ ভারতের মধ্যে দিয়ে পূর্ব ইউরোপ, ভূমধ্যসাগরীয় দেশ এবং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে চিনকে সংযুক্ত করেছিল। সুপ্রতিমের কথায়, "এখনও কি রেশম পথ একইভাবে উজ্জ্বল হয় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের আভায়, সেটাই দেখতে চেয়েছিলাম। কয়েক শতক ধরে এই পথ কত ইতিহাস আগলে রেখেছে, তা এখনও কতটা সমৃদ্ধ, তা জানতে ইচ্ছে করছিল খুব। সেই আকর্ষণেই আমাদের বেরিয়ে পড়া।"
গত এপ্রিল মাসে তুর্কমেনিস্তান হয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন সুপ্রতিম আর ঈপ্সিতা। গাড়ির স্টিয়ারিঙে বসে প্রকৃতিতে রঙের খেলা দেখতে দেখতে দিনরাতের হিসেব রাখতে ভুল হয়েছে কতবার। বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্থ শরীর ধাক্কা খেয়েছে। তবুও থামার প্রশ্ন নেই। মরক্কো হয়ে জর্জিয়া-তুরস্ক-গ্রিস-ইতালি-স্পেন-ফ্রান্স-সুইৎজারল্যান্ড- স্লোভানিয়া-ক্রোয়েশিয়া-বসনিয়া-সার্বিয়া- রাশিয়া-কাজাকাস্তান-উজবেকিস্তান-তাজাকিস্তান-খিরগিজস্তান হয়ে এখন চিনে এসে পৌঁছেছেন এই দম্পতি। এবার লক্ষ্য নেপাল হয়ে দেশে ফেরা।
সুপ্রতিম জানালেন, রবিবারই নেপাল পার হওয়ার চেষ্টা করবেন। তবে ধস নেমে রাস্তা বন্ধ বলে শুনেছেন। সেক্ষেত্রে তীব্বত-নেপাল বর্ডারে পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে, হেঁটে ওই পথটুকু পার হয়ে জিপে করে কাঠমাণ্ডু এসে কলকাতার প্লেনে উঠবেন। অক্টোবরের মাঝামাঝি রাস্তা ঠিক হলে ফিরিয়ে আনবেন শাহজাদীকে।
সুপ্রতিম ও ঈপ্সিতা জানালেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার পর তাদের শাহজাদীও ৪০ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পারি দিয়ে ফেলেছে। এবার তারও একটু বিশ্রাম দরকার। আপাতত ভারতে ছ'মাস জিরোনোর পরিকল্পনা রয়েছে। সুপ্রতীম বললেন, "আপাতত এই গাড়ি নিয়েই ভারতভ্রমণের ইচ্ছে। তারপর জাহাজে করে হয় হামবুর্গ নয়তো সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে দেব আমাদের শাহজাদীকে। দেশে থাকার মেয়াদ শেষ হলে আমরা প্লেনে পৌঁছে যাব সিঙ্গাপুর অথবা জার্মানিতে।" এর পরের পর্বটা এখনও তাঁদের কাছেও অজানা।