বললেন, “জীবনে যা করার নিজের হাতেই করতে চাই। মৃত্যুর পর কে কী করবে, তা ভাবার মানে দেখি না।”

ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 21 November 2025 18:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জীবিত অবস্থায় নিজের শ্রাদ্ধ নিজেই করলেন ৭৮ বছরের এক প্রাক্তন সেনা (78-year-old ex-soldier)! যাকে বলে, রীতিমতো ঘটা করে। এজন্য এলাকার প্রায় ৪০০ পরিবারে গিয়ে হাতজোড় করে আমন্ত্রণও করে এসেছিলেন তিনি।
জীবিত মানুষের কাছ থেকে তাঁর নিজের শ্রাদ্ধের আমন্ত্রণ শুনে গ্রামবাসীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো ভুল শুনছেন। পরে নিশ্চিত হতে গিয়ে বিস্ময় আরও বেড়েছে। কারণ, যিনি নিমন্ত্রণ জানালেন, তিনি একেবারে সুস্থ, সচল— পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের (Ketugram, East Burdwan) দাসপাড়ার ৭৮ বছরের প্রাক্তন সেনাকর্মী শান্তি দাস।
গত সোমবার গ্রামবাসীদের পাত পেড়ে খাইয়ে জীবিত অবস্থায় নিজেই করলেন নিজের শ্রাদ্ধ (performs his own Shraddha, search of peace of mind)। প্রায় ১১০০ জন অতিথি জমায়েত হয়েছিলেন তাঁর বাড়িতে। কীর্তন, মৎস্যভোজ, নিয়মমাফিক শ্রাদ্ধের সব উপাচার— সবটাই আয়োজন করেছিলেন শান্তি নিজে। আর এই অভিনব সিদ্ধান্তে সরগরম পুরো এলাকা। কেউ বিস্মিত, কেউ আবেগাপ্লুত, কেউ সমালোচনায় মুখর।
শান্তির স্ত্রী মারা গিয়েছেন বহু বছর আগে। এক ছেলে ও এক মেয়ের সঙ্গে নাকি সম্পর্কও এখন বেশ তিক্ত। তবে তাঁর বক্তব্য, এই আয়োজনের নেপথ্যে রাগ, অভিমান নয়— আছে মুক্তির আকাঙ্খা এবং মানসিক শান্তির সন্ধান। বললেন, “জীবনে যা করার নিজের হাতেই করতে চাই। মৃত্যুর পর কে কী করবে, তা ভাবার মানে দেখি না।”
প্রশ্ন করা হলে সন্তানদের প্রতি ক্ষোভ আছে কি না, শান্তি সরাসরি উত্তর দেননি। শুধু বলেছেন, “মনকে শান্ত রাখতে এই আয়োজন করেছি।” বৃদ্ধের দুই সন্তান বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি, অনুষ্ঠানের আগা গোড়া ছিলেন নির্বিকার, নীরব দর্শক।
গ্রামবাসীদের অনেকেই প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারেননি। নিমন্ত্রিতদের একজন বললেন, “ভাবলাম, হয়তো মজা করছেন। পরে বাড়িতে এসে দেখি পুরোপুরি নিয়ম মেনে শ্রাদ্ধ চলছে, আর যাঁর শ্রাদ্ধ— তিনিই অতিথিদের মাঝে বসে তদারকি করছেন!”
শান্তির নিজের শ্রাদ্ধ নিয়ে গ্রামে মতভেদ চরমে। কেউ বলছেন, ব্যক্তিস্বাধীনতা আর আত্মনির্ভরতার সাহসী উদাহরণ। তাঁদের মতে, সমাজের বাঁধাধরা রীতি ভেঙে জীবন সম্পর্কে অন্য এক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলেন বৃদ্ধ। অন্যদিকে অনেকে মনে করছেন, এরকম আয়োজন বাড়াবাড়ি, এমন অস্বাভাবিক সিদ্ধান্তের সামাজিক প্রভাব ভাল নাও হতে পারে।
তবে বিতর্কে বিচলিত নন শান্তি দাস। তাঁর একটাই বক্তব্য, “যা করার, এখনই করো। বেঁচে থাকতে করো। পরে বলে কিছু হয় না।”
জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে এই অপ্রচলিত পথ বেছে নেওয়া প্রাক্তন সেনাকর্মীর সিদ্ধান্ত এখন দাসপাড়ার গণ্ডি পেরিয়ে রাজ্যজুড়ে আলোচনার বিষয়। জীবিত মানুষের শ্রাদ্ধ— আচার, বিশ্বাস, সমাজবোধ— সবকিছুকেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাল তাঁর এই অভিনব পদক্ষেপ।