চৈতালী চক্রবর্তী
পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্র পড়া শেষ। কচি হাতে একরাশ ফুল-বেলপাতা মায়ের পায়ে ছুড়ে দিয়ে খিলখিলিয়ে হেলে উঠল একদল খুদে। সবার পরনে ঝলমলে পোশাক। একঝাঁক প্রজাপতি যেন। আরতির ঘণ্টার সঙ্গে ঢাকের বোল মিশে গিয়ে বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ ভেসে এল দক্ষিণ লন্ডনের সর্বজনীনে। গোটা হলঘরটা যেন এক লহমায় বদলে গেল তিলোত্তমার কোনও বনেদি বাড়ির ঠাকুর দালানে।
দক্ষিণ লন্ডনের পুজো। পঞ্জিকার নির্ঘণ্ট মেনে চারদিনেই মায়ের আরাধনা। তবে, নবমী ও দশমীর পুজোর ব্যবস্থা একই দিনে। মহালয়া থেকে শুরু হয়ে যায় পুজো প্রস্তুতি। প্রতিমা সাজানো থেকে পুজোর উপচার জোগাড়ে স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে হাত মেলান অবাঙালিরাও। সবাই মিলেই চন্দন বাটা, মালা গাঁথা। বেলপাতা বাছতে বাছতে বঙ্গরমণীদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে দেশের বাড়ির কথা। ছেলেবেলায় সবাই মিলে হই হই করে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার স্বাদ এখন স্মৃতির পাতাতেই বন্দি। বিদেশের মাটিতেই তাই চারদিন সেই ফেলে আসা আনন্দ খুঁজে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। হারান দিনে ফেরার হাতছানি।

সাবেকি প্রতিমা। এই পুজো থিমের চাকচিক্য থেকে অনেক দূরে। প্রবাসীদের মধ্যে থেকেই খেউ পুরোহিত, আবার কেউ ভোগের রাঁধুনি। ছোট ছোট বেদী সাজিয়ে সপরিবারে উমার বোধন। বিরাট বড় হলের মধ্যেই পুজোর যাবতীয় আয়োজন। সুন্দর করে আলো, ফুল দিয়ে গোটা ঘরটা নিজের হাতেই সাজান প্রবাসীরা। মহালয়া থেকে বিজয়া- সব দিনই কোনও না কোনও অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে। আয়োজক স্থানীয়েরাই। নবমীর পুজো ও দশমীতে বিসর্জন একই দিনে। সকালে আরতির পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিকেল ৪টে থেকে সিঁদুর খেলায় মাতবেন ভারতীয় মহিলারা। তারপর মিষ্টি মুখ শেষে বিজয়ার কোলাকুলি।

পুজো উদ্যোক্তারা জানালেন, চারদিন নিষ্ঠামতো পুজোর আয়োজন করা হয়। দেবীর আরাধনায় কলকাতা ও লন্ডনের মধ্যে কোনও পার্থক্যই থাকে না। শুধু দুর্গাপুজো নয়, দক্ষিণ লন্ডনের এই কমিটি কালী পুজোর আয়োজনও করে। ৬ নভেম্বর কালীপুজো। দশমীর পর থেকে তারও তোড়জোড় শুরু হয়ে যাবে পুরোদমে।

চারদিনই প্রসাদ ও ভোগ বিতরণের অঢেল ব্যবস্থা। ভোগের থালায় আলো করে থাকে নানা বাঙালি পদ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও এই পুজোর একটা বিশেষত্ব। রবীন্দ্রনৃত্য থেকে আধুনিক, সব আয়োজনই পাকা। ধ্রুপদ সঙ্গীতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এখানে। প্রবাসীদের সঙ্গে তাতে যোগ দেন লন্ডনের অধিবাসীরাও। নাচে, গানে জমজমাট হয়ে ওঠে পুজো।
তিলোত্তমার বনেদিয়ানা থেকে কোনও অংশেই কম যায় না দক্ষিণ লন্ডনের দুর্গাপুজো। লাল পাড়-সাদা শাড়ি, লাল সিঁদুরের টিপে মা'কে বরণ করেন বঙ্গনারীরা। নিজের হাতে বেড়ে দেন ভোগের রাঁধা খিচুড়ি, পোলাও। মায়ের আবাহনের সঙ্গেই সোনালী রঙে সেজে ওঠে গোটা লন্ডনের প্রকৃতি। মাতৃআরাধনায় মিলেমিশে এক হয়ে যায় এ পার, ও পার।